কারাগারে আদালত নতুন নয়

0
18

ঢাকা: আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কারাগারে আদালত বসিয়ে বিচার এটা নতুন কিছু নয়, বাংলাদেশে এর আগেও কারাগারে আদালত বসিয়ে বিচার করা হয়েছে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সময়ই এ রকম বিচার হয়েছে।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সভার সূচনা বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, খালেদা জিয়ার বিচার ক্যামেরা ট্রায়ালে হচ্ছে না। পুরো দরজা খোলাই ছিল। এটা ক্যামেরা ট্রায়াল হল কীভাবে?

প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, তার (খালেদা জিয়ার) আইনজীবীরা ভেতরে যাননি। তাদের (বিএনপির) কোনো কোনো আইনজীবী গেটে গিয়ে বসেছিলেন। কিন্তু কোর্ট রুমে ঢুকেননি। তারা আশপাশে বসেছিলেন। অবাধে সবাই যাতায়াত করতে পেরেছেন। এটা কীভাবে ক্যামেরা ট্রায়াল হয়?

বিএনপি নেতাদের বক্তব্যের জবাবে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, খালেদা জিয়ার মামলার বিচারে কোনো রাজনীতি নেই, কোনো প্রতিহিংসা নেই। সে এতিমের টাকা খেয়েছে বলেই আদালত তাকে সাজা দিয়েছেন। সে যদি নির্দোষ হতো তাহলে তার আইনজীবীরাই প্রমাণ করতে পারত যে, সে নির্দোষ। কাজেই অপরাধীর সাজা তো হবেই।

তিনি বলেন, এতিমের টাকা চুরি করে কেউ যদি জেলে যায় তার দায়-দায়িত্ব কার? প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১০ বছর মামলা চলছে। এ ১০ বছরে খালেদা জিয়ার আইজীবীরা প্রমাণ করতে পারলেন না সে নির্দোষ। সেই দোষটাও কি আমাদের সরকারের?

মঙ্গলবার বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আদালতে বলেছেন, আমাকে সাজা দেয়ার জন্যই এখানে আদালত বসানো হয়েছে। এখানে ন্যায়বিচার নেই। আপনাদের যা মন চায়, আমাকে যতদিন ইচ্ছা সাজা দিয়ে দেন। আমি অসুস্থ বারবার আদালতে আসতে পারব না।

খালেদা জিয়ার এমন বক্তব্যের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এটা কোন ধরনের কথা? একজন মানুষ যিনি সংবিধান মানেন, আইন মানেন, তিনি কিভাবে বলেন, আমি আদালতে যাব না, আপনারা পারলে সাজা দিয়ে দেন। নিজেকে নিরপরাধ মনে করলে তিনি অবশ্যই আদালতে আসবেন।

তিনি বলেন, আমার নামেও তো মামলা ছিল। কই আমি তো পালিয়ে যাইনি। তিনি (খালেদা জিয়া) কেন কোর্টে যান না? অপরাধী বলেই তিনি আদালতে যান না। খালেদা জিয়ার অপরাধী মন!

আদালতে বিএনপির আইনজীবীদের না আসা প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, বিএনপির অনেক আইনজীবী খালেদা জিয়ার হাজিরার সময়ে আসেন না। এটা বুঝতে হবে, হয় আইনি লড়াইয়ে তাকে নিরপরাধ প্রমাণ করতে পারবেন না অথবা তাকে বয়কট করেছেন।

বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, অসাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় যে দলের জন্ম সে দলের কাছ থেকে সংবিধানের কথা শুনতে হয়। খালেদা জিয়ার সঙ্গে যে গৃহপরিচারিকা থাকেন তাকে কোন আইনের বলে তার সঙ্গে রাখেন? খালেদা জিয়া ঘুমাতে পারবেন না বলে বিশেষ অর্থোপেডিক গদি সরবরাহ করেছি, এটা কোন আইনে আছে? এটা কী তিনি জানতেন না? অথচ খালেদা জিয়া যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখন বিমান বাহিনীর প্রধান, সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও রওশন এরশাদকে কারাগারের ফ্লোরে রেখেছেন। বিএনপি নেতাদের এ মিথ্যা অপপ্রচার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

যুক্তফ্রন্ট ও ড. কামাল হোসেনের জোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা চাই আওয়ামী লীগের একটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষ থাকুক। আমরা চাই তারা নির্বাচনে অংশ নিক। কিন্তু তারা যেন বিএনপি-জামায়াতের ওপর ভর না করে।

ড. কামালের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি নিজে সংবিধানপ্রণেতা হিসেবে দাবি করেন কিন্তু তিনি কিভাবে সংবিধানের বাইরে গিয়ে ক্ষমতা চান? ওই খাল কেটে কুমির আর আনতে দেব না।

আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সভায় দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, আবদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, কেন্দ্রীয় সদস্য এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনসহ অন্যরা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।

সভা সূত্রে জানা গেছে, দলের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে আওয়ামী লীগ। বরগুনা, রাজশাহী এবং ঠাকুরগাঁওয়ে যারা নিজ দলের এমপিদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন তাদের শোকজ করা হচ্ছে। আজ শোকজ নোটিশ পাঠাবে কেন্দ্র। জবাব সন্তোষজনক না হলে বহিষ্কার করা হতে পারে। একই সঙ্গে যেসব এমপিদের অবাঞ্ছিত করা হচ্ছে, তাদেরও চিঠি দিয়ে তৃণমূলের সঙ্গে অন্যৈকের কারণ জানতে চাওয়া হবে। সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর হারের পেছনে যারা কাজ করেছেন তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

সূত্র জানায়, বৈঠকে বরগুনার এমপি ধীরেন্দ্র নাথ শম্ভুকে এলাকায় অবাঞ্ছিত করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন আবদুর রহমান। এছাড়াও সিলেট সিটি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর হারের কারণ অনুসন্ধানের দাবি জানান। এ সময় কয়েকজন নেতা বলেন, অর্থমন্ত্রী ভোট দিতে গিয়ে টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেন, দু’জন প্রার্থীই ভালো, আমি নৌকায় ভোট দেব। এছাড়াও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ ও মহানগর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদের ভূমিকা ছিল হতাশাজনক। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, সামনে নির্বাচন, দলের বিরুদ্ধে গেলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। যারা নৌকার বিরোধিতা করেছেন, তাদের দল করার দরকার নেই।

এসব নেতাদের ভূমিকা অনুসন্ধানে আজকালের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে কমিটি গঠন করা হতে পারে। এসব কমিটি দ্রুত সময়ের মধ্যে দলের সভানেত্রীর কাছে প্রতিবেদন দেবে। একই সঙ্গে যারা বরগুনা, রাজশাহী এবং ঠাকুরগাঁওয়ে দলীয় এমপিকে অবাঞ্ছিত করেছেন তাদের বিরুদ্ধে কেন সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে না- তা জানতে চেয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হবে। জবাব সন্তোষজনক না হলে তাদের বহিষ্কার করা হবে। এমপিরাও কেন এলাকায় সবাইকে নিয়ে কাজ করতে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন সেটাও জানতে চাওয়া হবে। সতর্ক করা হবে তাদেরও। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিজেদের মধ্যে দলাদলি করে এক গ্র“প অপর গ্র“পকে অবাঞ্ছিত করলে দলের জন্য শুভ ফল বয়ে আনবে না। যারা দলের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ সময় বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, যাদের অবাঞ্ছিত করা হয়েছে এবং যারা অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন- উভয়কেই ঢাকায় তলব করা হবে।

বৈঠক সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের নেতা ও এমপিদের উদ্দেশে বলেছেন, আমি সারা দেশ সার্ভে করেছি। আরও করব। যথাসময়েই মনোনয়ন দেয়া হবে। একদিন আগেও নয়, পরেও নয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের জবাব দিতে কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে সরকারের উন্নয়নগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরতেও বলেন তিনি।

শহীদ ইব্রাহিমের পরিবারের পাশে প্রধানমন্ত্রী : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৮৪ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদ এইচএম ইব্রাহিম সেলিমের পরিবারের সহায়তায় এগিয়ে এসেছেন। বৃহস্পতিবার বিকালে গণভবনে এক অনুষ্ঠানে শহীদ সেলিমের মেয়ে নুসরাত জাহান ইব্রাহিমকে তাদের নিজ শহরে ১৫ শতাংশ জমি দান করেন।

শেখ হাসিনা নুসরাতের স্বামী মো. কামরুজ্জামানকে একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরিও দেন। এ সময় বাউফল পৌরসভার চেয়ারম্যান জিয়াউল হক জুয়েল উপস্থিত ছিলেন।