কাটছে আতঙ্ক বাড়ছে হতাশা

0
14

ঢাকা: বাবা-মা, ভাইবোনসহ পরিবারের ১১ জনকে নির্যাতনের পর হত্যা করেছে মিয়ানমারের সেনারা। শুধু অলৌকিকভাবে প্রাণে রক্ষা পেয়ে বাংলাদেশের সীমান্তে উখিয়ার একটি শিবিরে আশ্রয় নিতে পেরেছে রাখাইনের মংডু জেলার তুলাতলি গ্রামের কিশোর হাফিজুল্লা। এক বছর আগে চোখের সামনে স্বজনদের এমন পরিণতি এখনও হাফিজের কিশোর হৃদয়ে দগদগে ক্ষতের সৃষ্টি করে রেখেছে। সময়ের এই পরিক্রমা হাফিজের আতঙ্ক কিছুটা কমিয়ে দিলেও হতাশা বেড়েছে অনেকখানি। উখিয়ার কুতুপালংয়ে ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১২ আগস্ট দোভাষীর মাধ্যমে নিজের এই মানসিক অবস্থার কথা জানায় হাফিজ।

শুধু হাফিজ নয়, কথা হয় ওই ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া আরও ক’জন রোহিঙ্গার সঙ্গে। এক বছর আগে গণহত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনের মতো বিভীষিকার মধ্য দিয়ে আসা তাদের প্রত্যেকেরই গল্পটা যেন অভিন্ন। মাঝের সময়টায় তাদের আতঙ্ক কিছুটা কমলেও পেছনের কথা মনে করতেই স্বজন হারানোর বিচার ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তাদের হতাশা বাড়িয়ে দিচ্ছে বহুগুণে।

কুতুপালংয়ের ১১ নম্বর ক্যাম্পে পাহাড়ের ঢালুতে একটি ঝুপড়ি ঘরে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আশ্রয় মিলেছে মংডুর বাসিন্দা আছিয়া খাতুনের। আছিয়া বলছিলেন, বড় মেয়ে মরজানা বেগমকে বিয়ে দিয়েছিলেন নিজ এলাকা তুলাতলিতেই। গত বছরের ২৯ আগস্ট ওই পাড়ায় হানা দেয় সেনারা। মেয়ের শ্বশুরবাড়ির ১৩ জনকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে ওরা। মরজানা দৌড়ে বাপের বাড়ির দিকে আসার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সেনাদের সহায়তায় মগরা মেয়েটিকে ধরে নিয়ে যায়। পরদিন বিলের ভেতর মেয়ের ক্ষত-বিক্ষত লাশ পান তারা। আছিয়ার পাশের ঘরের বাসিন্দা বৃদ্ধা নূর আঙ্কিশ জানান, তুলাতলির সেই বিভীষিকার কথা। তার ভাষ্য, পুরো পাড়া থেকে সেদিন সুন্দরী তরুণীদের বাছাই করে নিয়ে যায় মগ আর মিলিটারিরা।

কুতুপালংয়ের ময়নারঘোনা এলাকায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অ্যাকশনএইডের তথ্য কেন্দ্রে কথা হয় আরেক কিশোর মো. আনিসের সঙ্গে। কথা বলার সময় আনিসের মামা মাওলানা কলিমুল্লাহও সঙ্গে ছিলেন। আনিস জানায়, মংডুর নাফ নদীর তীরঘেঁষা কুইন্নারপাড় এলাকায় তার বাবা শিক্ষক সুন আলীকে কি নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। এখন সে বাবার হত্যার বিচার চায়। কিন্তু সেটা কীভাবে তা জানে না। আনিস শুধু এতটুকু জানে, ভিন দেশের এই আশ্রয়শিবিরে থাকলে বাবার হত্যার বিচার সে পাবে না। এ জন্য তাকে রাখাইনে ফিরতে হবে। তবে এক বছরেও সেই সম্ভাবনা তৈরি না হওয়ায় সে হতাশ।

কথা হয় অ্যাকশনএইডের মানবিক রেসপন্স বিভাগের প্রধান মো. আব্দুল আলীমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ক্যাম্পগুলোতে থাকা রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশুদের ভয়ার্ত মানসিক অবস্থার পরিবর্তনে তারা কাজ করছেন। নানা ভাগে ভাগ করে তাদের কাউন্সেলিং করানো হচ্ছে। এতে আতঙ্ক কাটিয়ে তাদের মনোবল মজবুত হচ্ছে। তবে দিনের পর দিন আশ্রয়শিবিরে মানবেতর অবস্থার মধ্যে থাকতে থাকতে রোহিঙ্গাদের একটা অংশ হতাশ হয়ে পড়ছে। হতাশা দূর করতে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

হতাশার কারণ খুঁজতে কথা হয় কয়েকজন রোহিঙ্গা তরুণের সঙ্গে। তাদেরই একজন আকবর মিয়া জানান, গত এক বছরে ক্যাম্পে তাদের জীবনমান আগের চেয়ে গোছানো হয়েছে। তবে তারা মাতৃভূমিতে ফিরতে চান। অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল না থেকে কাজ করতে চান। তাই নানা মাধ্যমে দেশে ফেরানোর প্রতিশ্রুতি পেয়েও তার বাস্তবায়ন না দেখে তাদের মনে অবিশ্বাস আর সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

আকবর মিয়ার কথার সত্যতা পাওয়া গেল ক্যাম্পের নানা পথ ঘুরে। এক বছর আগে রোহিঙ্গারা যখন স্রোতের মতো কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে আসতে থাকে, তখন এসব এলাকায় বিশৃঙ্খলা ছিল। তাদের কেউ খোলা আকাশের নিচে ঠাঁই নিয়েছিল, কারও মাথার ওপর ছাদ ছিল এক টুকরো পলিথিন। এখন সে পরিস্থিতি পাল্টেছে। বিশাল পাহাড়ি এলাকাজুড়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে আশ্রয়কেন্দ্র তৈরিতে পরিকল্পনার ছাপ দেখা গেছে। প্রয়োজনের তুলনায় কম হলেও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট, গোসলখানা এবং বিশুদ্ধ পানি সরবরাহও বেড়েছে। একটু অবস্থাপন্ন কোনো কোনো ঘরে দেখা মিলেছে সোলার প্যানেল ও বৈদ্যুতিক পাখার। এ ছাড়া বিশাল এলাকাজুড়ে পাহাড় কেটে এরই মধ্যে গড়ে তোলা হয়েছে ইটের চওড়া রাস্তা। যার ওপর পিচ ঢালাইয়ের কাজও শুরুর দিকে।

অবশ্য ক্যাম্প ঘিরে এমন উন্নয়ন আর সব কিছুতেই একটা স্থায়ী রূপ দেখে রোহিঙ্গারা ভাবতে শুরু করছেন, তাদের মাতৃভূমিতে ফেরার প্রতীক্ষাটা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতরই হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রত্যাবাসন নিয়ে চলতি বছরের শুরুতে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিক যে চুক্তি করেছিল তা বাস্তবায়ন না হওয়া।

কুতুপালং ১২ নম্বর ক্যাম্পে ইউনিসেফ পরিচালিত একটি স্কুলের শিক্ষক রোহিঙ্গা সাদেক হোসেন বলেন, তারা জেনেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কয়েক দিন আগে মংডু পরিদর্শন করেছেন। তিনি ধ্বংসস্তূপ দেখেছেন। দুই দেশের কর্মকর্তারা প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনাও করেছেন। তার পরও আন্তর্জাতিকভাবে জোরালো তৎপরতা না থাকায় মাতৃভূমিতে ফেরার ব্যাপারে তারা আশাবাদী হতে পারছেন না।

এসব বিষয়ে ১৪ আগস্ট কক্সবাজারের একটি হোটেলে অ্যাকশনএইড আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. শাহ কামাল বলেন, রোহিঙ্গারা যাতে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে না পড়ে, শিশুরা বিকশিত হতে পারে, সেজন্য ক্যাম্পগুলোতে সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে। সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বিদেশি সংস্থা এতে সহায়তা দিচ্ছে। এখন আশ্রয়শিবিরে রোহিঙ্গারা আগের চেয়ে ভালো আছে। তবে রোহিঙ্গারা চিরদিন ক্যাম্পে থাকবে না। মিয়ানমারে তাদের অধিকারগুলো পেলেই ফিরে যাবে। তাদের ফিরে যাওয়ার জন্য নানা স্তরে যোগাযোগ, আলোচনা চলছে।