একান্ত সাক্ষাৎকারে শিরীন শারমিন চৌধুরী, সিপিএ সম্মেলনে গুরুত্ব পাচ্ছে রোহিঙ্গা ইস্যু

0
96

ঢাকা: ঢাকায় শুরু হওয়া কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের (সিপিএ) ৬৩তম সম্মেলনে এজেন্ডায় না থাকলেও রোহিঙ্গা ইস্যু বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। দেশে দেশে জাতীয়তাবাদের উত্থান সম্পর্কিত একটি সেশনে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আলোচনার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া সম্মেলনে অংশ নেওয়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জনপ্রতিনিধিদের পরিস্কার ধারণা দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

সিপিএর চেয়ারপারসন ও জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী সম্মেলন শুরুর আগে সমকালের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে জানান, বিদেশি মেহমানদের আগ্রহের কারণে সিপিএ এমপিদের একটি প্রতিনিধি দলের কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর র্’যাডিসন ব্লু’ হোটেলে সিপিএ চেয়ারপারসনের নিজ কক্ষে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সম্মেলন বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে, যখন প্রতিবেশী একটি দেশের (মিয়ানমার) কারণে বাংলাদেশকে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হচ্ছে।

সিপিএর পূর্ববর্তী সম্মেলনটি ঢাকায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও গুলশানের হলি আর্টিসান বেকারির জঙ্গি হামলার পরে নিরাপত্তার কারণে তা বাতিল করা হয়েছিল। এবার সিপিসি (কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি কনফারেন্স) জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় ৫ নভেম্বর উদ্বোধন হতে যাচ্ছে।

শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, এই সম্মেলনে আটটি সেশন থাকবে। এসব সেশনের সুপারিশগুলো যৌথ ঘোষণায় স্থান পাবে। এজেন্ডা অনেক আগেই নির্ধারিত হওয়ায় নতুন করে রোহিঙ্গা ইস্যুতে এজেন্ডা নির্ধারণের সুযোগ নেই। তবে বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা ইস্যু খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় সব বিদেশি এমপির জন্য একটি ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়েছে। সম্মেলনের উদ্বোধনী দিন ৫ নভেম্বর বিকেলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী তাদের কাছে বিষয়টি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করবেন। ইস্যুটি যাতে বেশি ফোকাস পায় সে জন্যই এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সিপিএ বাংলাদেশ শাখা বিভিন্ন সেশনে আলোচনার সুযোগ নিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যু তুলে ধরতে পারবে। কিন্তু এর ওপর নির্ভর না করে পৃথকভাবে ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়েছে।

স্পিকার বলেন, ‘রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘে ৫টি প্রস্তাব দিয়েছেন। এই প্রস্তাবের আলোকে সিপিএ এমপিদের কাছ থেকে আমরা সহযোগিতা চাইব।’

তিনি জানান, সম্মেলনে আটটি সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা আছে। সিপিএর রীতি অনুযায়ী আলোচিত এজেন্ডাগুলোতে প্রস্তাব গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ নয়। সম্মেলন শেষে যৌথ ঘোষণাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সব সেশনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কেই যৌথ ঘোষণায় সমন্বয় করা হয়।

তিনি জানান, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডসহ বেশকিছু দেশের প্রতিনিধি দলের পক্ষ থেকে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তারা রোহিঙ্গা বিষয়ে বিস্তারিত জানার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। ব্রিটিশ ও কানাডার এমপিরা রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনেরও আগ্রহ ব্যক্ত করেছেন। আরও যারা আগ্রহী রয়েছেন তাদের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

এক প্রশ্নের জবাবে সিপিএর চেয়ারপারসন বলেন, গ্লোবালাইজেশনের এই যুগেও দেশে দেশে জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটছে। কী ধরনের অনুভূতি নিয়ে এই জাতীয়তাবাদের প্রসার ঘটছে তা একটি সেশনে আলোচনা হবে। সম্মেলনের ষষ্ঠ দিনে ‘হোয়াট ফ্যাক্টরস ফুয়েল দ্য রেইস অব ডিফারেন্ট কাইন্ডস অব ন্যাশনালিজম’ শিরোনামে এ সেশনটি ৬ নভেম্বর বিকেলে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারের এক্সিকিউটিভ লাউঞ্জে হবে। জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশের যে প্রতিনিধি দল এই সম্মেলনে থাকবে তারা এই সেশনে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলার সুযোগ নিতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এক প্রশ্নের জবাবে শিরীন শারমিন জানান, এর আগে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) সম্মেলন বর্জন করলেও এবারে পাকিস্তানের সিপিএ ব্রাঞ্চ ঢাকায় আসছে। পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে বেশকিছু বিষয় রয়েছে যা দু’দেশের দ্বিপক্ষীয় সমস্যা। এ নিয়ে সিপিএ সম্মেলনে কোনো আলোচনার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের এমপিরা চাইলে এ বিষয়ে পাকিস্তানের এমপিদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করতে পারেন।

সিপিএর চেয়ারপারসন বলেন, এবারের সম্মেলন থেকে বাংলাদেশের নানভাবে উপকৃত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। বাণিজ্য, ভিসা, ভ্রমণ ও শুল্ক্কমুক্ত পণ্যের বিষয়ে কমনওয়েলথভুক্ত ৫২টি দেশ নিজেদের মধ্যে দূরত্ব কমাতে এই সম্মেলনে ভূমিকা রাখবে। এ সংক্রান্ত একটি সেশনও রয়েছে বলে জানান তিনি।

তিনি জানান, গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে সংসদের ভূমিকা কীভাবে বাড়ানো যায় সে বিষয়ে এই সম্মেলনে আলোচনা হবে। এ ছাড়া সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, এসডিজি (টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা) ও জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সেশন রয়েছে। তরুণদের কীভাবে পার্লামেন্টারি কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা যায় এবং তারা কেন রাজনীতিবিমুখ- এসব বিষয়ে এবারের সম্মেলনে একটা বড় ধরনের সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলেও জানান শিরীন শারমিন চৌধুরী।

নিজের দায়িত্ব পালনের তিন বছরে ‘কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি ইয়ুথ রোড শো’ কর্মসূচির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এ সম্মেলনে তরুণদের নানাভাবে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। সম্মেলনে একটি ইয়ুথ রাউন্ড টেবিল প্রোগ্রাম থাকছে। এখানে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত তিনটি রোড শোতে অংশ নেওয়া যুবকদের মধ্য থেকে ১৮ জনকে এই রাউন্ডে নিয়ে আসা হবে। তাদের সঙ্গে সিপিএর নয়টি অঞ্চলের নয়জন এমপি মতবিনিময় করবেন। এরপর তারা ভাগ হয়ে দুই গ্র্রুপে নিজেরা কথা বলবে। এই আলোচনার উদ্দেশ্য হলো- এ যুবকদের চিন্তা-ভাবনাগুলো কীভাবে পার্লামেন্টারি কার্যক্রমের মাধ্যমে সরকারের নীতিনির্ধারণ প্রভাবিত করতে পারে সেই উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা। এ ছাড়া সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ৫০ জন যুবককে দর্শক হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে একজন যুবককে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।

মেয়াদ ফুরাল শিরীন শারমিনের : সিপিএ চেয়ারপারসনের পদে তিন বছরের মেয়াদ ফুরিয়ে গেছে শিরীন শারমিন চৌধুরীর। সিপিএর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন নারী চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন তিনি ২০১৪ সালে। তবে এবারের সম্মেলনেও নারী চেয়ারপারসন পেতে যাচ্ছে সিপিএ। শিরীন শারমিন জানান, ক্যারিবীয়, প্যাসিফিক ও আফ্রিকান অঞ্চল থেকে চেয়ারপারসন পদে তিনজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তিনজনই নারী।

নিজের দায়িত্ব পালনকালে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের পরিচিতি তুলে ধরতে সাধ্যমতো চেষ্টা চালানোর দাবি করে শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, এই সময়ে তিনি সিপিএর একাধিক নতুন কর্মসূচি চালু করেছেন। যার মধ্য দিয়ে সিপিএ কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। বিশেষ করে নারী ও তরুণ সমাজের অংশগ্রহণ বাড়ানোই ছিল তার মূল লক্ষ্য। এ কাজে তিনি কতটা সফল তা বিচারের ভার ছেড়ে দিয়েছেন সদস্য রাষ্ট্রগুলোর এমপিদের কাছে।