উখিয়ায় ত্রাণ বিতরণকালে খালেদা জিয়া, রোহিঙ্গা ফেরাতে বিশ্বকে কাজে প্রমাণ দিতে হবে

0
46
কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ান, মিয়ানমারকে চাপ দিন * দীর্ঘদিন রাখা সম্ভব নয়, সেনাবাহিনীর প্রশংসা * নবজাতককে কোলে নিয়ে আপ্লুত খালেদা জিয়া * গাড়িবহরে হামলা করে লাভ হবে না, সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে
রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে সরকারকে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। একই সঙ্গে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন। সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, সরকারের যেভাবে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত ছিল, সেভাবে তারা তা করেনি এবং করছেও না। বরং যারা কাজ করতে চায় তাদেরও নানাভাবে বাধা দেয়া হচ্ছে। সোমবার উখিয়ার ময়নারগোনা রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণকালে খালেদা জিয়া বলেন, শুধু রিলিফ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বড় দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু উপরে উপরে কথা, নিন্দা প্রকাশ এবং সহানুভূতি জানালেই হবে না, কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে। শনিবার গাড়িবহরে হামলার নিন্দা জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেছেন, কারা হামলা করেছে সরকার তা জানে। তাদের ছবিও দেখানো হয়েছে। এভাবে হামলা করে লাভ হবে না। বরং এগুলো করে সরকার সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।

কক্সবাজার সফরের তৃতীয় দিনে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের দেখতে যান। তিনি ময়নারগোনা, হাকিমপাড়া, বালুখালী-২ ক্যাম্প এবং ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মেডিকেল ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। খালেদা জিয়া শনিবার সড়কপথে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম এবং রোববার রাতে কক্সবাজার আসেন। সোমবার বেলা ১টার দিকে কক্সবাজার থেকে সড়কপথে উখিয়ার ময়নারগোনা শিবিরে আসেন। সেখানে তিনি কিছু রোহিঙ্গা পরিবারের হাতে ত্রাণসামগ্রী তুলে দেন। সকালে ১০ হাজার পরিবারের জন্য ৪৫ ট্রাক ত্রাণসামগ্রী সেনাবাহিনী হাতে তুলে দেয়া হয় বিএনপির পক্ষ থেকে। বিকাল ৪টায় তিনি ফের কক্সবাজার সার্কিট হাউসে গিয়ে বিশ্রাম নেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে তিনি কক্সবাজার ত্যাগ করেন। রাতে তিনি চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে অবস্থান করে আজ সড়কপথে ঢাকায় ফিরবেন।

ত্রাণসামগ্রী বিতরণের সময় সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় খালেদা জিয়া বলেন, মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে হবে, সেখানে তাদের নিরাপদে ও নির্ভয়ে থাকতে দিতে হবে। আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং প্রভাবশালী দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আপনারা অবিলম্বে এ সমস্যার সমাধানে এবং তাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে তৎপরতা বাড়ান। সরকারকে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে বলব। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকেও দায়িত্ব নিতে হবে। আমরা আবারও আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে আপিল করছি, আপনারা শুধু কথা বললে হবে না, কাজের মাধ্যমে দেখিয়ে দিতে হবে এবং বাংলাদেশের প্রতিও খেয়াল রাখতে হবে।

দীর্ঘদিন রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে রাখা সম্ভব নয় মন্তব্য করে খালেদা জিয়া বলেন, নানা কারণে রোহিঙ্গাদের এখানে রাখা সম্ভব নয়। রোহিঙ্গারা গাছ কাটছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। দীর্ঘদিন আমাদের পক্ষে এটা বহন করা সম্ভব নয়।

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে এবং ১৯৯২ সালে তার (খালেদা জিয়া) সরকারের সময়ে নেয়া পদক্ষেপও এ সময় তিনি তুলে ধরেন। বলেন, জিয়াউর রহমানের আমলেও রোহিঙ্গারা এসেছিল। তখন আলোচনার মাধ্যমে তাদের ফিরিয়ে দেয়া হয়েছিল। ’৯২ সালে বিএনপি সরকারের সময়ও এসেছিল। তখনও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করেছি।

বিএনপির চেয়ারপারসন বলেন, সরকার এ পর্যন্ত কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। সরকারকে অবিলম্বে উদ্যোগ নিতে হবে। নিরাপত্তা ও নাগরিকত্বসহ রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়ে বসবাসের ব্যবস্থা করার জন্য তিনি মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

রোহিঙ্গাদের পাশে থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ গরিব এবং এটি একটি ছোট দেশ। এ দেশের মানুষের মন আছে ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা আছে। সে জন্য তারা গরিব হয়েও নিজের পকেট থেকে যে যেভাবে পারছে তাদের (রোহিঙ্গা) সাহায্য করছে, তাদের কষ্ট ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে।

ময়নারগোনা থেকে বালুখালীতে ড্যাবের ক্যাম্প পরিদর্শন করতে গিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, ‘সেনাবাহিনীকে আমি ধন্যবাদ জানাব তারা সুন্দরভাবে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। বিএনপির নেতাকর্মী ও উখিয়ার জনগণকেও ধন্যবাদ জানান রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। বিএনপি রোহিঙ্গাদের পাশে আছে, থাকব, আমরা রিলিফ কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। প্রথম থেকে আমাদের ড্যাব (ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন) মেডিকেল ক্যাম্প কাজ করছে।’ এ সময় বিএনপির চেয়ারপারসন মেডিকেল ক্যাম্পকে ৫ হাজার শিশুখাদ্য ও ৫ হাজার প্রসূতি নারীর ওষুধসামগ্রী প্রদান করেন।

খালেদা জিয়া বলেন, মানবতার কাজে উখিয়ায় এসেছি। রোহিঙ্গাদের কিছু সাহায্য করার জন্য। আসার পথে গাড়িবহরে হামলা করা হয়েছে এবং অনেক সাংবাদিক আহত হয়েছেন। কারা আহত করেছে, কারা হামলা করেছে সরকার তা জানে। তাদের ছবিও দেখানো হয়েছে। সরকারকে এগুলো বন্ধ করতে হবে। এসব করে লাভ হবে না। এসব বাদ দিয়ে মানবতার খাতিরে সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

এ সময় খালেদা জিয়ার সঙ্গে ছিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, ড. আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, বরকত উল্লাহ বুলু, মোহাম্মদ শাহজাহান, মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, শামসুজ্জামান দুদু, নিতাই রায় চৌধুরী, এজেডএম জাহিদ হোসেন, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, গোলাম আকবর খন্দকার, জয়নুল আবদিন ফারুক, আবদুস সালাম, কেন্দ্রীয় নেতা ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন, খায়রুল কবির খোকন, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, ফজলুল হক মিলন, মাহবুবুর রহমান শামীম, শামা ওবায়েদ, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, নাজিম উদ্দিন আলম, আবদুস সালাম আজাদ, খন্দকার মাশুকুর রহমান, মহিলা দলের আফরোজা আব্বাস, সুলতানা আহমেদ, যুবদলের সাইফুল আলম নীবর, সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, স্বেচ্ছাসেবক দলের শফিউল বারী বাবু, আবদুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল, ছাত্রদলের রাজিব আহসান, আকরামুল হাসান, ঢাকা মহানগরের কাজী আবুল বাশার, বজলুল বাছিত আনজু, আহসান উল্লাহ হাসান, চট্টগ্রামের ডা. শাহাদাৎ চৌধুরী, আবু সুফিয়ান, গিয়াস কাদের চৌধুরী, স্থানীয় সাবেক এমপি লুৎফর রহমান কাজল, হাসিনা আহমেদ, জেলা সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক শামীম আরা স্বপ্না, উখিয়ার সরওয়ার জাহান চৌধুরী, সুলতান মাহমুদ চৌধুরী প্রমুখ।

ময়নারগোনা রোহিঙ্গা শিবিরে একদল নারীর খোঁজখবর নিতে গিয়ে জানতে চান আপনারা কেমন আছেন। জবাবে রোহিঙ্গা নারীরা তাদের ওপর মিয়ানমারের সেনা নির্যাতনের করুণ কাহিনী শোনান খালেদা জিয়াকে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কম বয়সী আমিরা নামের এক মায়ের নবজাতক কাঁদতে থাকলে তিনি কোলে তুলে নেন। তার কান্না থামাতে গিয়ে এ সময় খালেদা জিয়াকে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়তে দেখা যায়। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দলের সিনিয়র নেতারাও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

খালেদা জিয়াকে আরিয়া নামের রোহিঙ্গা নারী রাখাইন ভাষায় বলেন, ‘নো খাইয়ে, পাহাড়-পর্বত আডি আডি আসছি। ওনেরার দেশ আইসি। আর বেডা (স্বামী) মাইরেজে।’ খালেদা জিয়া সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, ধৈর্য ধরুন। আল্লাহর কাছে দোয়া চান।

পরে তিনি হাকিমপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যান এবং সেখানেও ডোয়েন নামে অসহায় এক শিশুকন্যাকে কোলে তুলে আদর করেন। পরে খালেদা জিয়া বালুখালী শিবিরে যান এবং সেখানে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেন ও শিশুদের আদর করেন। সর্বশেষ ২০১২ সালের জুনে কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ পল্লীতে হামলা ও ভাংচুরের পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে কক্সবাজারে আসেন খালেদা জিয়া।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here