ইরাকের পরিস্থিতিতে ‘লজ্জিত’ সাদ্দামকে জিজ্ঞাসাবাদকারী সিআইএ’র এজেন্ট

0
94
সাবেক সিআইএ এজেন্ট জন নিক্সন, ছবি: বিবিসি
সাবেক সিআইএ এজেন্ট জন নিক্সন, ছবি: বিবিসি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরাকে ২০০৩ সালের পর যা কিছু ঘটেছে তার জন্য নিজেকে লজ্জিত মনে করেন সাদ্দামকে জিজ্ঞাসাবাদকারী সিআইএ’র সাবেক এজেন্ট জন নিক্সন। ২০০৩ সালে নিজের খামারবাড়ির বাঙ্কার থেকে আটকের পর সিআইএ’র প্রয়োজন হয়েছিল তাকে চিহ্নিত এবং জিজ্ঞাসাবাদের। আর সেই কাজটি করেছিলেন জন নিক্সন।

২০১১ সালে সিআইএ ছেড়ে আসা নিক্সন সম্প্রতি বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন সাবেক ইরাকি প্রেসিডেন্টকে জিজ্ঞাসাবাদের সেই অভিজ্ঞতার কথা।

১৯৯৮ সালে সিআইএ যোগ দেওয়ার পর সাদ্দাম হোসেনকে নিয়ে পড়াশুনা শুরু করেছিলেন নিক্সন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্বের ক্ষমতাশালী নেতাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে জানতে তাদের সম্পর্কে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করতেন নিক্সন।
তিনি বলেন, ‘যখনই কোন সঙ্কট উপস্থিত হতো, তখন কে এবং কেন এটা করছে তা জানতে নীতিনির্ধারকেরা আমাদের কাছে আসত।’

নিজ জন্ম শহর তিকরিতের খামারবাড়ির ছোট্ট একটি বাঙ্কার থেকে যখন সাদ্দাম হোসেনকে আটক করা হয় তখন ইরাকেই ছিলেন নিক্সন। খবরটি যখন প্রথম আসে যুক্তরাষ্ট্রের তখন প্রথম প্রয়োজন হয়েছিলো তাকে চিহ্নিত করে জিজ্ঞাসাবাদ করা। নিক্সন বলেন, ‘তখন গুজব ছিল সাদ্দামের অনেকগুলো ডামি দেহ রয়েছে, তবে প্রথম দেখেই সাদ্দাম হোসেনকে চিনতে পেরিছিলাম।’

আটকের পর ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন, ছবি: গেটি ইমেজ

‘যখন কথা বলা শুরু করি তখন তিনি (সাদ্দাম হোসেন) সেই দৃষ্টিতে কয়েকবার আমার দিকে তাকিয়েছিলেন যা আমি আমার ডেস্কে রাখা বইয়ে কয়েকবছর ধরেই দেখছি।’ বিবিসিকে বলছিলেন নিক্সন।

বেশ কয়েকদিন ধরে সাদ্দাম হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন নিক্সন। বিবিসির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে অনেকটা মজা করেই নিক্সন বলছিলেন, ‘বিশ্বের মোস্ট ওয়ান্টেড ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করার উত্তেজনায় নিজেকে কয়েকবার চিমটি কেটেছিলাম। দেখতে বেশ হাস্যকর লাগছিল।’

‘ডিব্রিফিং দি প্রেসিডেন্ট: দি ইন্টারোগেশন অব সাদ্দাম হোসেন’ নামে একটি বই লিখেছেন জন নিক্সন। ওই বইতে তিনি সাদ্দাম হোসেনকে ‘বৈপরিত্যে ভরা’ একজন মানুষ বলে বর্ণনা করেছেন। পশ্চিমা মিডিয়ার চোখে নিষ্ঠুর সাদ্দাম হোসেনের মধ্যে অনেক মানবিক গুণ দেখেছেন নিক্সন। নিজের দেখা অন্যতম সহজাত দক্ষতা সম্পন্ন মানুষ ছিলেন সাদ্দাম যখনই চাইতেন তখনই তিনি কমনীয়, হাস্যজ্জোল হয়ে উঠতে পারতেন। বলছিলেন নিক্সন।

মাটির নিচের ছোট্ট এই বাঙ্কার থেকে আটক হয়েছিলেন সাদ্দাম হোসেন, ছবি: গেটি ইমেজ

বিপরীতে যখন মেজাজ হারিয়ে ফেলতেন তখন তিনি কঠোর, হিংস্র আর অহংকারী হয়ে উঠতেন বলেও জানান নিক্সন। জিজ্ঞাসাবদের সময় দুই থেকে তিনবার তিনি এমন হয়ে উঠেছিলেন বলেও জানান নিক্সন।

ছোট অপরিষ্কার একটি কক্ষে লোহার একটি ভাজ করা চেয়ারে যখন সাদ্দামকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছিল তখন তিনি অসংযত আচরণ করেছিলেন বলে জানান নিক্সন। ওই কক্ষে তখন নিক্সন একজন পলিগ্রাফার (মিথ্যা নির্ণয়কারী) ও একজন অনুবাদক থাকতেন।

প্রথম সেশনের আলাপচারিতায় সাদ্দামের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছিলেন নিক্সন। যাতে পরবর্তী আলাপচারিতা এগিয়ে নিয়ে যেতে সহজ হয়। কয়েকমাস ধরে লুকিয়ে থাকার পর বেশি কিছু আলাপের ছিল না বলে দাবি করেন নিক্সন।
একটি ইতিবাচক শুরুর পরের দিন থেকেই সন্দেহজনক হয়ে উঠতে থাকেন সাদ্দাম। যখনই তাকে কোন প্রশ্ন করা হচ্ছিল তখনই তিনি নিক্সনের জন্য কোন প্রশ্ন রেখে যাচ্ছিলেন। বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর ব্যক্তির ইতিহাস জানা ও রেকর্ড রাখার দরকার ছিল সিআইএ’র।

সংস্থার হয়ে এসব বিষয়ে কাজ করার প্রশিক্ষণ ছিল নিক্সনের। কিন্তু তাকে খুবই সতর্ক থাকতে হচ্ছিল ভুল পথে এগিয়ে কোন সত্য বের করে আনার কাজ করতে গিয়ে।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় ছিল ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্রের মজুদ সম্পর্কে কোন তথ্য থাকলে তা বের করে আনা। এই অস্ত্র থাকার অজুহাতেই যুক্তরাষ্ট্র আর যুক্তরাজ্য ইরাকে যুদ্ধ শুরু করে। নিক্সন বলেন, হোয়াইট হাউজ বারবার এই তথ্য জানতে চাইলেও সাদ্দাম হোসেন ও তকার অনুসারীরেদ জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সিআইএ নিশ্চিত হয় ইরাকি নেতা কয়েকবছর আ্গে তার দেশের পরমানু অস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করে দিয়েছিলেন। আর তা পুনরায় শুর করার কোনো পরিকল্পনাও তাদের ছিল না।

২০০৮ সালে এফবিআই আলাদা অনুসন্ধানে এই সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার আগে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের কাছে এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানাতে পারেননি বলে জানান নিক্সন।

জর্জ ডব্লিউ বুশ, ইরাকে হামলা যার নির্দেশে, ছবি: প্রিয়. গেটি ইমেজ

সাদ্দাম পরবর্তী ইরাকে যা কিছু ঘটেছে তার জন্য লজ্জিত নিক্সন। তিনি বলেন বুশ প্রশাসন সাদ্দাম হোসেন ছাড়া ইরাকের পরিস্থিতি নিয়ে মোটেও ভাবেনি। আর সে কারণেই ইসলামিক স্টেটের মতো চরমপন্থি ইসলামী দলগুলোর তৎপরতা বেড়েছে।
তবে নিক্সনের দাবি নাকচ করেছেন যুক্তরাজ্যের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার।

প্রসঙ্গত, কয়েক দশক ধরে ইরাকের শাসন ক্ষমতায় থাকা সাদ্দাম হোসেনের কাছে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে এমন অজুহাতে ২০০৩ সালে ইরাকে হামলা চালায় ‍যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। পতন হয় সাদ্দামের। ওই বছরের ১৫ ডিসেম্বর মার্কিন বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন তিনি। পরে ২০০৬ সালে এক অনুষ্ঠিত এক বিচারের মাধ্যমে ৩০ ডিসেম্বর সকালে ফাঁসিতে ঝোলানো হয় তাকে। ১৯৮২ সালে শিয়া সম্প্রদায়ের উপর চালানো এক গণহত্যার অভিযোগ আনা হয়েছিল তার বিরুদ্ধে।

সূত্র: বিবিসি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here