ইন্দিরাই গড়েন ভারতের অর্থনীতির ভিত

0
132

আর্ন্তজাতিক ডেস্ক: ‘মানুষ নিজে কিছু নয়, আসল ব্যাপার হচ্ছে নানা ঘটনা, নানা পরিবেশ, নানা আন্দোলন, যা তাকে গড়ে তোলে’—এই ছিল যার জীবনদর্শন তার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের সম্পর্ক একান্তই আত্মার। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা সেই সম্পর্ককে নিয়ে রেখেছে অন্যরকম এক উচ্চতায়। তিনি ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে ভারতের যে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার মূলে ছিলেন তিনিই।

নেহেরুতনয়া ইন্দিরার আজ জন্মশতবার্ষিকী। শতবর্ষের সেই ইন্দিরা আজও ভারতের রাজনীতিতে প্রবলভাবে প্রাসঙ্গিক। তার প্রাসঙ্গিকতা যেমন সমাজ বিনির্মাণে, তেমনি অর্থনৈতিক সংস্কারে। দারিদ্র্যমুক্ত ভারত গড়তে তার ‘গরিবি হটাও’ শ্লোগান এখনও অনূরণিত কোটি কোটি প্রাণে। ভারতের সংবিধানে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা অন্তর্ভুক্ত করেন তিনিই। তার আমলেই ভারতে গড়ে ওঠে গণমুখী অর্থনীতি। একই সঙ্গে জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন তিনি। জাতীয় প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে তার যে নীতি-দর্শন তা এখনও ভারতের রাজনীতিতে দৃশ্যমান। তাই বাস্তবিক অর্থেই বলা যায়, আজকের ভারতের যে অর্থনৈতিক ভিত তা ইন্দিরার হাতেই গড়া।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধী-আনন্দবাজার পত্রিকার সৌজন্যে

১৯৬৯ সালের কথা। ইন্দিরা গান্ধীর সাহসী এক উদ্যোগে দেশের ব্যাংক ও খনি জাতীয়করণ হয়। সংবিধানে রাষ্ট্রীয় চরিত্রে ‘সমাজতন্ত্রী’, ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দ যোগ হয় তার শাসনামলেই। সাংবাদিক জয়ন্ত ঘোষাল লিখেছেন, ”ইন্দিরা ’৬৯ সালে যখন ব্যাংক জাতীয়করণ করেন, তখন প্রবীণ সাংবাদিক ইন্দর মলহোত্র এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া জানতে দিল্লির রাজপথে ভিড়ের মধ্যে আমজনতার সঙ্গে কথা বলেন। পথে পথে তখন চলছে উৎসব। সাংবাদিক ইন্দর নিজেই সে কথা স্বীকার করেছেন। তিনি এক রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করেন, তুমি কি কোনও দিন ব্যাংকে গেছো? সে বলল, না। তা হলে এই গরিব মানুষরা রাস্তায় নামছে কেন? তোমরা কি এবার ব্যাংকে যাবে? ‘না’। তা হলে এত আনন্দ কেন? নাচছো কেন তোমরা? জবাবে সেই রিকশাওয়ালা বলেছিলেন, ‘বুঝছ না? শেষ পর্যন্ত গরিব মানুষের জন্য কেউ কিছু করল। এবার বড়লোকদের শিক্ষা হবে।’ এভাবে, এই ঘটনার মাধ্যমে ইন্দিরা গান্ধী হয়ে উঠেছিলেন জনগণের প্রধানমন্ত্রী।” (আনন্দবাজার পত্রিকা ১৯ নভেম্বর, ২০১৭)

তবে ‘জনগণের প্রধানমন্ত্রী’ হয়ে ওঠা মোটেও বাধাহীন ছিল না। মন্ত্রিসভাতেও ছিল বিরোধিতা। অর্থমন্ত্রী মোরারজি দেশাই ছিলেন ব্যাংক জাতীয়করণের ঘোর-বিরোধী। ইন্দিরার নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি। ইন্দিরা এর জবাবে শুধু বলেছিলেন, ‘ব্যাংক-খনি জাতীয়করণ’ দেশের গরিব মানুষের অধিকার। এরপর মোরারজি দেশাইকে মন্ত্রিত্ব থেকে সরিয়ে দেন ইন্দিরা।

১৯৬৬ সালে অন্ধ্রপ্রদেশে হিংসাত্মক আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে একটি স্টিল প্লান্টকে ঘিরে। প্রায় একই সময় দিল্লিতে গো-হত্যা বন্ধের দাবি তোলেন সাধুরা। তাদের ওই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত হিংসাত্মক রূপ নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দিল্লিতে কারফিউ জারি করতে হয়। পরের বছর মঙ্গা দেয় বিহারে। বিধানসভা নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের ধকল তো ছিলোই। কিন্তু সবকিছুই নিজের মতো করে সামলে নেন ‘রাজনীতিক ইন্দিরা’।

বাবা জওহরলাল নেহেরুর সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধী-সংগৃহীত

এরপর সময়ের পরিক্রমায় ভারতের রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারকে হটিয়ে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার গঠন করেছে। এখন একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সরকার গঠন করে দেশ শাসন করছে বিজেপি। কংগ্রেস নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং তার আমলে দেশকে মুক্ত অর্থনীতির পথে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী সামাজিক দায়বন্ধতা থেকে দারিদ্র্যদূর করার কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ধনি-গরিব ভারসাম্যহীনতা দূর করতে নোট বাতিলের মতো সাহসি পদক্ষেপ নিয়েছেন। কিন্তু সবকিছুর মূলেই যেন ইন্দিরার সেই ‘গরিবি হঠাও’ শ্লোগান।

১৯৭১ সালে ইন্দিরা গান্ধীর ভূমিকা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বিরাট এক অধ্যায়। এদেশের মানুষের মুক্তিসংগ্রামে তার সহযোগিতা ছিল সর্বাত্মক। মুজিবনগর সরকার গঠন হলে পাকিস্তানিদের গণহত্যার বিষয়টি বিশ্বব্যাপী তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি পাকিস্তানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘ভারতের পক্ষে আর চুপ থাকা সম্ভব নয়।’ এরপর বিরোধীদলের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সার্বিক সহায়তার সিদ্ধান্ত নেন। বেলগ্রেডে বিশ্বশান্তি সম্মেলনেও তুলে ধরেন বাংলাদেশের পরিস্থিতি। নয় মাসের মুক্তিসংগ্রামে অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করেন। পাকিস্তানের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অবস্থান চ্যালেঞ্জ করে বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখেন। বাংলাদেশ থেকে শরণার্থী হয়ে যাওয়া প্রায় ১ কোটি মানুষের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। আর একপর্যায়ে ভারতীয় সৈন্যদের পাঠিয়ে দেন মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করতে।

ছেলে রাজীব গান্ধী (বাঁয়ে) ও সঞ্জয় গান্ধীর সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধী-সংগৃহীত

এ বিষয়ে নিমাইসাধন বসুকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, ‘…বাংলাদেশে একটা কিছু ঘটছে, কিন্তু সত্যি বলতে কি, অবস্থার গুরুত্ব সম্পর্কে পরে আমরা সচেতন হই। কি যে করবো, সে বিষয়ে মনস্থির করা যাচ্ছিল না। এদিকে শরণার্থীদের স্রোত এসে ঢুকে পড়ছিল আমাদের দেশে, অথচ এ-ও আমাদের মনে হচ্ছিল যে, অন্য দেশের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা আমাদের উচিত হবে না। কিন্তু কিছু একটা যে আমরা করতে পারি, করা উচিত, সেটাও আমরা বুঝতে পারছিলাম। সে কারণেই তখন আমি বিশ্ব সফরে যাই। কেননা আমার তখন মনে হচ্ছিল যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড এবং অন্য কিছু দেশে হয়ত পাকিস্তানের ওপরে প্রভাব বিস্তার করতে পারে; হয়তো তারা বুঝতে পারে যে, বাংলাদেশের অবস্থাটা ঠিক কি। এত মামুলি একটা ব্যাপার নয়, এটা বিরাট একটা অসন্তোষ, অনেকদিন আগে থেকেই যা কিনা মর্মের একেবারে গভীরে তার শিকড় চালিয়েছে।’

সাক্ষাৎকারে ইন্দিরা আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের ব্যাপারে আমরা যদি হস্তক্ষেপ না-ই করতাম। কী হত তাহলে? বাংলাদেশ সে ক্ষেত্রেও স্বাধীনতা পেত। কিন্তু যেমন তাদের, তেমনি আমাদেরও ক্ষেত্রে আরও অনেক বেশি ক্ষয়ক্ষতি হত। এটা আমি স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলাম। একই সঙ্গে তখন এ-ও বুঝেছিলাম যে, বাংলাদেশের ব্যাপারে আমাকে অনেক অসুবিধার সম্মুখীন হতে হবে। একটা দেশ যে তখন কি করেছিল, তা তো কেউ মনে রাখেনি। সত্যি বলতে কি, এমন কাজ এর আগে আর কোথাও কোন দেশ করেছে কিনা, তাতে আমার সন্দেহ আছে।’

সূত্র: ‘আমি: ইন্দিরা গান্ধী’; লেখক নিমাইসাধন বসু, আউটলুক ইন্ডিয়া ও হিন্দুস্তান টাইমস

</