আলজাজিরার অনুসন্ধান, যেভাবে মোসাদের ফাঁদে লেবানিজ শিল্পী জিয়াদ

0
52

আর্ন্তজাতিক ডেস্ক: ইসরাইলের সন্দেহভাজন গুপ্তচর হিসেবে আটকের আগ পর্যন্ত জিয়াদ আহমাদ ইতানি ছিলেন একজন সফল শিল্পী, সাংবাদিক এবং নাট্যকার। তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত কাহিনী দেখে অনুমান করা কঠিন যে তিনি ইসরাইলের কুখ্যাত বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের পক্ষে কাজ করবেন।

ইতানির ব্যাপারটি হয়তো ভিন্নতর, তবে বিচ্ছিন্ন নয়। ইসরাইলের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ২৪ নভেম্বর তাকে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে লেবানিজ সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ আনা হয়েছে। লেবাননের গুপ্তচরবৃত্তির মামলা দেখভালকারী সংস্থা দ্য লেবানিজ স্টেট’স সিকিউরিটি নিশ্চিত করেছে যে ইতানির বিরুদ্ধে ইসরাইলের পক্ষে কাজ করার অভিযোগ আনা হয়েছে। অথচ ইসরাইলকে শত্রু রাষ্ট্র মনে করে থাকে লেবানন।

স্টেট’স সিকিউরিটির বিবৃতিতে বলা হয়, বৈরুতে ইতানির বাসভবনে গুপ্তচরবৃত্তির ভয়াবহ প্রমাণ মিলেছে। এর মধ্যে রয়েছে মাদক, চারটি ল্যাপটপ, পাঁচটি মোবাইল ফোন। এগুলোতে গোপন তথ্য সংরক্ষণ করা হতো। বিবৃতিতে বলা হয়, অভিযোগ স্বীকার করেছেন ইতানি। তার পক্ষে কোনো আইনজীবী দাঁড়াননি। তাকে এখনও আদালতে তোলা হয়নি। তিনি গ্রেফতার আছেন।

চিরায়ত মধুচক্র : দীর্ঘদিন ধরেই মোসাদ আরব নাগরিকদের তার নিজ দেশের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তিতে কাজে লাগাচ্ছে। ১৯৫০-এর দশক থেকে মোসাদ যাদেরকে নিয়োগ দিত তারা আরব সমাজের রাজনৈতিক ও সামরিক এলিটদের সমাজে অনুপ্রবেশের ক্ষমতা রাখতেন। কিন্তু ইতানির নিয়োগ ইসরাইলের সেই চিরায়ত পদ্ধতির সঙ্গে খাপ খায় না। তবে তার নিয়োগ প্রক্রিয়াও ছিল অভিন্ন। লেবাননের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের তদন্তের গোপনীয় নথি আলজাজিরার হাতে এসেছে। এতে দেখা যায়, সুইডিশ রমণীর ছদ্মাবরণে ইতানিকে নিয়োগ দেয় এক মোসাদ এজেন্ট। এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় ‘মধুচক্র’। ভিডিওটেপের জবানবন্দিতে ইতানি জানান যে, তার যৌনজীবনের ফুটেজ দেখিয়ে তাকে মোসাদের পক্ষে কাজ করতে বাধ্য করা হয়। আল আখবার সংবাদপত্রের উপ-সম্পাদক পিয়ের আবি সাব বলেন, ইতানির মামলাটিতে বোঝা যাচ্ছে মোসাদ নতুন গোয়েন্দা যুদ্ধ শুরু করেছে। তারা চায় আরব রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইসরাইলকে একটি স্বাভাবিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হোক। কারণ অব্যাহতভাবে আরব ভূমি দখলের কারণে তাদেরকে একটি শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হয়।

১৯৭৯ সালে মিসরের সঙ্গে এবং ১৯৯৪ সালে জর্ডানের সঙ্গে ইসরাইলের শান্তি চুক্তির আগ পর্যন্ত আরব ও ইউরোপের দেশগুলোতে মোসাদ ইসরাইলের শত্রুদের হত্যা করতো এবং এজন্য তাদের কোনো জবাবদিহির বালাই ছিল না। মোসাদ সমাজের উচ্চস্তরে গুপ্তচর নিয়োগ দিত।

যেমন মোসাদ ১৯৭২ সালে খ্যাতনামা ফিলিস্তিনি বুদ্ধিজীবী ও লেখক ঘাসান কানাফানিকে বৈরুতে হত্যা করে। ১৯৮২ সালে মিসরের পরমাণুবিজ্ঞানী ইয়াহিয়া এল মাশাদকে প্যারিসে খুন করে গোয়েন্দা সংস্থাটি। তবে মিসর ও জর্ডানের সঙ্গে শান্তি চুক্তি এবং অন্য আরব দেশগুলোর সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক কিন্তু নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলার পর থেকে মোসাদ অধিকৃত ভূখণ্ডে ফিলিস্তিনিদের হত্যা করতে থাকে।

বর্তমানে আরব দেশগুলোর রাজধানীতে মোসাদের মিত্র আছে এবং তারা মিসর, জর্ডান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে হাতে হাত রেখে অভিন্ন শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়ছে। আরব দেশগুলোর গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। এর মাধ্যমে তারা আল কায়দা ও ইসলামিক স্টেটের মধ্যে অনুপ্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে। ফিলিস্তিনের জাতীয়তাবাদী ও ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে একযোগে কাজ করছে মোসাদ ও আরব দেশগুলোর গোয়েন্দারা।

আবি সাব বলেন, আরব সরকারগুলোর সহায়তা পেয়ে মোসাদ এখন একদিকে আরব ভূমি দখল করছে অন্যদিকে ইসরাইলের ব্যাপারে আরব জনগণের অনুকূল মনোভাব গড়ে তোলার দিকে মনযোগ দিচ্ছে। এক্ষেত্রে মোসাদের সহযোগী হচ্ছে আরব বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, অভিনেতা ও চলচ্চিত্রকাররা। ইতানির কথাই ধরা যাক। বৈরুতে দুটি গণমাধ্যমে কাজ করতেন তিনি। পরে কমেডি চিত্রকর ও নাট্যকার হিসেবে লেবানিজ সমাজে জনপ্রিয়তা পান তিনি। ইতানির বন্ধুরা বলছেন, তারা তাকে প্রগতিশীল রাজনৈতিক চিন্তার এবং লেবাননের রাজনীতির ব্যাপারে জাতীয়বাদী বলেই মনে করতেন।