আমি অসুস্থ না, আবার ফিরে আসব: প্রধান বিচারপতি

0
73

ঢাকা: প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছেন, আমি অসুস্থ না। আমি পালিয়েও যাচ্ছি না। আমি আবার ফিরে আসব। আমি একটু বিব্রত। আমি বিচার বিভাগের অভিভাবক। বিচার বিভাগের স্বার্থে, বিচার বিভাগটা যাতে কলুষিত না হয়, এ কারণেই আমি সাময়িকভাবে যাচ্ছি। আমার কারও প্রতি কোনো বিরাগ নেই। আমার দৃঢ়বিশ্বাস, সরকারকে ভুল বোঝানো হয়েছে। এই আমার বক্তব্য। আর কিছু বলব না। আমি লিখিত বক্তব্য দিচ্ছি। এই হল আমার লিখিত বক্তব্য।

শুক্রবার রাতে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ার আগে হেয়ার রোডের বাসার সামনে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের প্রধান বিচারপতি এ কথা বলেন। বক্তব্যের কপি সাংবাদিকদের হাতে তুলে দিয়ে তিনি বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা দেন।

সবুজ কালিতে তার স্বাক্ষরিত বক্তব্যটি নিচে হুবহু তুলে ধরা হল-
‘আমি সম্পূর্ণ সুস্থ আছি। কিন্তু ইদানীং একটা রায় নিয়ে রাজনৈতিক মহল, আইনজীবী ও বিশেষভাবে সরকারের মাননীয় কয়েকজন মন্ত্রী ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে ব্যক্তিগতভাবে যেভাবে সমালোচনা করেছেন এতে আমি সত্যিই বিব্রত। আমার দৃঢ়বিশ্বাস, সরকারের একটা মহল আমার রায়কে ভুল ব্যাখ্যা প্রদান করে পরিবেশন করায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার প্রতি অভিমান করেছেন, যা অচিরেই দূরীভূত হবে বলে আমার বিশ্বাস। সেই সঙ্গে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে আমি একটু শঙ্কিতও বটে। কারণ গতকাল (বৃহস্পতিবার) প্রধান বিচারপতির কার্যভার পালনরত দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রবীণতম বিচারপতির উদ্ধৃতি দিয়ে মাননীয় আইনমন্ত্রী প্রকাশ করেছেন যে, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি অচিরেই সুপ্রিমকোর্টের প্রশাসনে পরিবর্তন আনবেন। প্রধান বিচারপতির প্রশাসনে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কিংবা সরকারের হস্তক্ষেপ করার কোনো রেওয়াজ নেই। তিনি শুধু রুটিনমাফিক দৈনন্দিন কাজ করবেন। এটিই হয়ে আসছে। প্রধান বিচারপতির প্রশাসনে হস্তক্ষেপ করলে এটি সহজেই অনুমেয় যে, সরকার উচ্চ আদালতে হস্তক্ষেপ করছে এবং এর দ্বারা বিচার বিভাগ ও সরকারের মধ্যে সম্পর্কের আরও অবনতি হবে। এটি রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না।’

প্রধান বিচারপতি বিমানবন্দরে যাওয়ার উদ্দেশে রাত ৯টা ৫৬ মিনিটে স্ত্রী সুষমা সিনহাকে নিয়ে বাসা থেকে বের হন। ১০টা ৩০ মিনিটে হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিআইপি গেট দিয়ে তিনি বিমানবন্দরে প্রবেশ করেন। পরে রাত ১১টা ৫৫ মিনিটে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে তিনি একাই সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে যাত্রা করেন। সেখান থেকে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার কথা আছে। আর বাসা থেকে বের হওয়ার আগেই তার মালামাল তিনি বিমানবন্দরে পাঠিয়ে দেন।

প্রধান বিচারপতির প্রটোকল কর্মকর্তা আবদুল ওয়ারেস গণমাধ্যমকে বলেন, স্যার একাই বিমানে উঠেছেন। ম্যাডাম উনাকে তুলে দিতে এসেছিলেন।

এর আগে সকাল থেকে দিনভর তার বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি চলে। নিকটাত্মীয়রা ছাড়াও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বাসায় আসা-যাওয়া করেন। কেউ কেউ ঢাকা ত্যাগের আগপর্যন্ত তার সঙ্গে ছিলেন। তার বিদেশ যাওয়া না যাওয়া নিয়ে দিনভর নানারকম গুজবও ছিল। অবশ্য আগের দিন বৃহস্পতিবার আইনমন্ত্রী আনিসুল হক প্রধান বিচারপতির ছুটি ও বিদেশ যাওয়ার বিষয়টি গণমাধ্যমের কাছে নিশ্চিত করেন।

প্রধান বিচারপতি কখন কোন ফ্লাইটে বিদেশ যাচ্ছেন তা নিশ্চিত হতে গণমাধ্যমকর্মীদের শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এরপর দুপুরের দিকে ফ্লাইট নম্বর ও সময় জানাজানি হয়ে যায়।

অবশ্য সার্বক্ষণিক এ খবরটির সঙ্গী হতে গণমাধ্যমকর্মীদের অনেকে সকাল থেকেই রাজধানীর হেয়ার রোডে অবস্থান করেন। এ সময় প্রধান বিচারপতির আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে বেলা ১১টায় তার ভাই ড. এনকে সিনহা বাসভবনে প্রবেশ করেন। এরপর ভাতিজি জামাই রাজ মনু সিংহ দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে, আরও দুই ভাতিজি জামাই সুজিত সিনহা ও রামকান্ত সিনহা প্রবেশ করেন সকাল ১০টা ২২ মিনিটে। এক মিনিট পর শ্যালিকা শীলা সিনহা ও তার মেয়ে সীমা সিনহা প্রধান বিচারপতির বাসায় যান।

সন্ধ্যা ৬টার দিকে সুপ্রিমকোর্টের স্পেশাল অফিসার ইসমাইল হোসেন দেখা করতে প্রধান বিচারপতির বাসভবনে ঢোকেন। সোয়া ৬টায় তার একান্ত সচিব আনিসুর রহমান ও সুপ্রিমকোর্টের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার সাব্বির ফয়েজ সেখানে আসেন। ইমিগ্রেশনে ঢোকা পর্যন্ত সাব্বির ফয়েজ ও আনিসুর রহমান প্রধান বিচারপতির সঙ্গে ছিলেন। এর আগে তাকে বিমানবন্দর পর্যন্ত এসকর্ট দিতে পুলিশের দুটি পিকআপ ভ্যান প্রধান বিচারপতির বাসভবনে প্রবেশ করে।

প্রধান বিচারপতি ছুটিতে যাওয়ার পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই উচ্চপর্যায়ের লোকজন ছাড়াও স্বজনরা তার বাসায় যাওয়া-আসা করছেন। গত সপ্তাহেও তার বেয়াই-বেয়াইন, ভাইসহ স্বজনরা দেখা করতে বাসায় যান। শুক্রবার রাত ১১টা ৫৫ মিনিটে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে প্রধান বিচারপতির জন্য টিকিট কাটা হয়। ফ্লাইট এসকিউ-৪৪৭ সিঙ্গাপুরের স্থানীয় সময় ভোর ৬টায় পৌঁছার কথা। সেখানে ৪৫ মিনিট যাত্রাবিরতি করে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত মেয়ে সূচনা সিনহার বাড়ির উদ্দেশে রওনা হবেন। সিঙ্গাপুর থেকে অস্ট্রেলিয়া পৌঁছতে ৭ ঘণ্টা সময় লাগবে।

সুপ্রিমকোর্টের ২৫ দিনের অবকাশ শেষে প্রথম কার্যদিবসেই (৩ অক্টোবর) অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে ২ অক্টোবর এক মাসের (৩ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর) ছুটি চেয়ে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের কাছে চিঠি পাঠান প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। রাষ্ট্রপতি ওই ছুটি মঞ্জুরও করেন। পরে বিদেশ যাওয়ার বিষয়ে সরকারি আদেশের (জিও) প্রসঙ্গ এলে মঙ্গলবার সুরেন্দ্র কুমার সিনহা রাষ্ট্রপতিকে জানান, তিনি ১৩ অক্টোবর থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ায় থাকতে চান।

বিষয়টি রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর বৃহস্পতিবার আইন মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে। এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ওই দিন সাংবাদিকদের জানান, প্রধান বিচারপতি অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে যেতে চান।

বিষয়টি আইন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনেও উল্লেখ করা হয়। বৃহস্পতিবার আইন সচিব আবু সালেহ শেখ মো. জহিরুল হকের স্বাক্ষরে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, প্রধান বিচারপতির আবেদনে এর আগে ৩ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত ৩০ দিনের ছুটি মঞ্জুর করেন রাষ্ট্রপতি।

কিন্তু বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা যেহেতু আরও বেশিদিন বিদেশে থাকবেন, সেহেতু রাষ্ট্রপতি নতুন আদেশ দিয়েছেন। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বর্ধিত ছুটিতে প্রধান বিচারপতির বিদেশে অবস্থানের সময়, অর্থাৎ ২ থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত, অথবা তিনি দায়িত্বে না ফেরা পর্যন্ত বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা প্রধান বিচারপতির কার্যভার সম্পাদন করবেন।

এর আগে জিওসংক্রান্ত নথিতে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের স্বাক্ষরের পর বৃহস্পতিবার সকালে আইন মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে।

ছুটিতে যাওয়ার দুই দিন পর ৫ অক্টোবর তিনি অস্ট্রেলিয়ার পাঁচ বছরের ভিসার জন্য আবেদন করেন। পরে তিনি ঢাকেশ্বরী মন্দিরে যান পূজা-অর্চনা করতে। ৮ অক্টোবর স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য আইসিডিডিআর,বি এবং এর কয়েক দিন পর বনানীতে যান দাঁতের ডাক্তার দেখাতে। ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পাওয়া সুরেন্দ্র কুমার সিনহা আগামী ৩১ জানুয়ারি অবসরে যাবেন।

প্রধান বিচারপতির ছুটিতে যাওয়ার বিষয়টি সামনে আসার পর থেকে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সিনিয়র নেতারা এবং বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের নেতারা প্রায় প্রতিদিনই এর প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন। তারা বলছেন, প্রধান বিচারপতির ইচ্ছার বিরুদ্ধে সরকার জোর করে তাকে ছুটি দিয়ে বিদেশ পাঠিয়ে দিচ্ছে। শুক্রবারও এ নিয়ে দিনভর সরব ছিল মাঠের বিরোধী দল বিএনপি।

উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে নেয়া সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় দেয়ার পর থেকে বিচার বিভাগের সঙ্গে সরকারের এক ধরনের টানাপোড়েন শুরু হয়, যা পর্যায়ক্রমে উত্তপ্ত হয়ে প্রকাশ্যে আসে।
উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে নিতে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব সংসদে পাস হয়, যা ষোড়শ সংশোধনী হিসেবে পরিচিত।

নয়জন আইনজীবীর রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০১৬ সালের ৫ মে সংবিধানের ওই সংশোধনী ‘অবৈধ’ ঘোষণা করে রায় দেন। গত ৩ জুলাই আপিল বিভাগও ওই রায় বহাল রাখেন। যার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ পায় ১ আগস্ট। রায়ের পর্যবেক্ষণের এক স্থানে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘মানবাধিকার ঝুঁকিতে, দুর্নীতি অনিয়ন্ত্রিত, সংসদ অকার্যকর, কোটি মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত।’ ৭৯৯ পৃষ্ঠার রায়ে সরকার, সংসদ, রাজনীতি, নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, সামরিক শাসন এবং রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন বিষয়ে এমন অনেক পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে।

এরপরই প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার দেয়া পর্যবেক্ষণের তীব্র সমালোচনা করেন সরকারের মন্ত্রী-এমপি ও নেতারা। এমনকি কোনো কোনো মন্ত্রী এবং বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের নেতারা প্রধান বিচারপতির পদত্যাগের দাবিতে সরব হন। পাশাপাশি রায়ে প্রধান বিচারপতির দেয়া পর্যবেক্ষণও স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে প্রত্যাহারের দাবি জানান। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা বেশ কিছুদিন ধরে এ বিষয়টি নিয়ে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালন করে আসছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here