আন্তর্জাতিক গণআদালতের রায়, গণহত্যায় সুচি ও মিন অং দোষী

0
74

রোহিঙ্গা ও ক্ষুদ্র মুসলিম জনগোষ্ঠীকে তাদের অধিকার ও নাগরিকত্ব দিতে হবে * নিপীড়িত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্যমূলক আইনের সংস্কার করতে হবে * ১৭ দফা সুপারিশসহ রায়ের কপি আন্তর্জাতিক আদালতে পাঠানো হবে * আন্তর্জাতিক জনমত তৈরিতে এ রায় ভূমিকা রাখবে : শাহরিয়ার কবির * আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য হবে মিয়ানমার -মানবাধিকার কমিশন

রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালানোর দায়ে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সুচি ও সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হিলাইংসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের দোষী সাব্যস্ত করেছেন আন্তর্জাতিক গণআদালত। শুক্রবার সকালে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে রোমভিত্তিক সংগঠন পার্মানেন্ট পিপলস ট্রাইব্যুনালের (পিপিটি) সাত সদস্যের বিচারকের প্যানেল এ প্রতীকী রায় ঘোষণা করেন।

মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মালয়ার ল’ ফ্যাকাল্টি বিভাগে পিপিটির ওই বিচার প্রক্রিয়া গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা, কাচিন, কারেনসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর ২০০ মানুষের জবানবন্দি গ্রহণ এবং বিভিন্ন তথ্যচিত্র ও বিশেষজ্ঞ মতামত পর্যালোচনা করা হয়। ১৮ থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শুনানির পর শুক্রবার রায় ঘোষণা করলেন তারা।

রায়ে সর্বসম্মতভাবে ১৭ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। এতে মিয়ানমারের ওপর অবিলম্বে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারি, মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মিয়ানমারের সরকারি পদে থাকা ব্যক্তিদের বিদেশে থাকা ব্যাংক হিসাব বাজেয়াপ্ত, মিয়ানমারের বাইরে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

১৭ দফা সুপারিশসহ রায়ের কপি আন্তর্জাতিক আদালতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। বিচারকদের পক্ষে কুয়ালালামপুরের মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদে আর্জেন্টাইন ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব জেনোসাইড স্কলার্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিচারক দানিয়েল ফিয়েরেস্তেইন রায় পড়ে শোনান। এ রায়ের মধ্য দিয়ে সুচিই প্রথম কোনো নোবেলজয়ী, যিনি ব্যতিক্রমী এ আদালতে বিচারের সম্মুখীন ও দোষী সাব্যস্ত হলেন।

প্রায় ৩০ পৃষ্ঠার প্রাথমিক রায়ের বিভিন্ন অংশ ট্রাইব্যুনালের সাতজন বিচারক ভাগ করে পাঠ করেন। অস্ট্রেলিয়ার সিডনির মেকুইয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক প্রধান বিচারক জিল এইচ বোয়েরিঙ্গার ১৭টি সুপারিশের কয়েকটি তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা, কাচিন ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতার অনুসন্ধানের জন্য জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধান দলকে অবশ্যই সে দেশে ভিসা এবং সহজে প্রবেশাধিকার দিতে হবে। মিয়ানমার সরকারকে অবশ্যই সংবিধান সংশোধন করতে হবে। নিপীড়িত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্যমূলক আইনের সংস্কার করতে হবে।

মিয়ানমার সরকারকে তাদের সংবিধান সংশোধন করে সব জাতিগোষ্ঠীকে নাগরিকত্বের অধিকার দেয়ার পাশাপাশি সব ধরনের বৈষম্যমূলক আইন বাতিল করতে হবে। তাদের অধিকার ও নাগরিকত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশ, মালয়েশিয়াসহ যেসব দেশ লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর ভার বহন করছে, তাদের আর্থিকভাবে সহযোগিতা করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিও আহ্বান জানানো হয়েছে পিপলস ট্রাইব্যুনালের সুপারিশে।

এদিকে আন্তর্জাতিক গণআদালতের রায়ের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কাজী রিয়াজুল হক বলেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে গণআদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিকভাবে চাপে পড়বে সুচির সরকার। আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য হবে মিয়ানমার।

তিনি বলেন, এ রায়ে সারা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। আমরা বিশ্ববাসীর কাছে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যার যে অভিযোগ আনছি, সেটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে মিয়ানমার সরকার আলোচনায় বসে সমস্যা সমাধানের একটা উপায় খুঁজে বের করবে।

পিপলস ট্রাইব্যুনালের আমন্ত্রণে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কাজী রিয়াজুল হকও গণআদালতের শুনানিতে অংশ নেন।

সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের কয়েকটি আশ্রয় কেন্দ্র ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা তিনি কুয়ালালামপুরে তুলে ধরেন। আন্তর্জাতিক গণআদালতের শুনানিতে প্যানেল বিচারক হিসেবে অংশ নেন ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব জেনোসাইড স্কলার্সের সাবেক সভাপতি দানিয়েল ফিয়েরেস্তেইন, ইসরাইলের যুদ্ধাপরাধ তদন্ত-প্রক্রিয়ায় যুক্ত মালয়েশীয় অধিকারকর্মী জুলাইহা ইসমাইল, ঢাকার সেন্টার ফর স্টাডি অব জেনোসাইড অ্যান্ড জাস্টিসের উপদেষ্টা কম্বোডীয় আইনজীবী হেলেন জার্ভিস, অস্ট্রেলিয়ার মেকুইয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক প্রধান গিল এইচ বোয়েরিঙ্গার, ইন্দোনেশিয়ার মানবাধিকার আইনজীবী নুরসিয়াবানি কাতজাসুংকানা, ইরানের মানবাধিকার কর্মী আইনজীবী সাদি সদর এবং ইতালির সুপ্রিমকোর্টের সলিসিটর জেনারেল নেল্লো রোসি।

গণআদালতের সুপারিশ তুলে ধরে অধ্যাপক গিল এইচ বোয়েরিঙ্গার বলেন, গণআদালতের বিচারে উঠে আসা সব তথ্য-প্রমাণ, রায় এবং সুপারিশ আইসিসি ছাড়াও জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন ও গোষ্ঠীর কাছে পাঠানো হবে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোতে রায় পাঠানো হবে, যাতে তারা মিয়ানমার সরকারকে চাপ দিতে পারে। বিচার কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা মালয় ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর সিভিলাইজেশন ডায়ালগের পরিচালক চন্দ্র মোজাফফর এ রায়কে মিয়ানমার সরকারের অপরাধ চিহ্নিত করার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেন।

আসিয়ান বা ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থায় এই পিপলস ট্রাইব্যুনালের তথ্য-প্রমাণ কাজে লাগানো যাবে বলেও তিনি মত দেন। তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালের তথ্য অনুসন্ধান এবং বিচারকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে আসিয়ান, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের পদক্ষেপ নেয়া উচিত।

গণআদালতের শুনানিতে রোহিঙ্গা ও কাচিন সম্প্রদায়ের লোকজন তাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত রাষ্ট্রীয় অপরাধের বর্ণনা দেন। আদালতে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ম্যাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনোসাইড স্টাডিজ অ্যান্ড প্রিভেনশনের গবেষক অধ্যাপক গ্রেগরি স্ট্যানটনও জবানবন্দি দেন।

তিনি বলেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার দায়ে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী, পুলিশ, অন্যান্য বৌদ্ধ মিলিশিয়া এবং দেশটির বর্তমান বেসামরিক সরকার অভিযুক্ত। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের সর্বস্তরে বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার। রায়ের পর যুগান্তরের মালয়েশিয়া প্রতিনিধি আহমাদুল কবির অধ্যাপক গ্রেগরি স্ট্যানটনের সঙ্গে কথা বলেন।

এ সময় তিনি যুগান্তরকে বলেন, ১৯৬২ সালে নে উইনের নেতৃত্বাধীন সামরিক জান্তা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে রোহিঙ্গা, কাচিন, শান, কারেন এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নির্যাতন শুরু হয় যা আজও অব্যাহত আছে।

সংখ্যালঘুর বিরুদ্ধে দেশটিতে পদ্ধতিগত নিপীড়ন চলছে। অধ্যাপক স্ট্যানটন তার জবানবন্দিতেও রোহিঙ্গা ও কাচিনদের ওপর সামরিক বাহিনী ও পুলিশ কীভাবে গণহত্যা চালিয়েছে সে বিষয়ে তথ্য উপস্থাপন করেন। গ্রেগরি স্ট্যানটন বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার দায়ে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য বৌদ্ধ মিলিশিয়