আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস, বসতভিটে হারানোর শঙ্কা মধুপুর গড়ের আদিবাসীদের

0
278

untitled-3_229460ঢাকা ডেস্ক: ২০০৪ সালের কথা। মধুপুর গড়ের জয়নাগাছা গ্রাম। জানুয়ারির পড়ন্ত বিকেল। উদ্বিগ্নমনে নিজেদের নিকোনো উঠোনে লাকড়ি (জ্বালানি কাঠ) কাটছিলেন নেজেন্দ্র নকরেক (৬০)। উৎকণ্ঠায় লাকড়ির গায়ে ঠিকমতো বসছে না কুঠারের কোপ। চিন্তার বলিরেখা স্পষ্ট হয়ে উঠছে ঘর্মাক্ত কপালে। শুনছেন, যুগ যুগ ধরে ভোগদখলে থাকা তাদের জমি নিয়ে নেবে বন বিভাগ। বাস্তুহারা হবেন তারা। এমন সময় প্রতিবেশী কেউ একজন দৌড়ে এসে জানালেন পিরেন গুলিবিদ্ধ, মারা গেছেন। পিরেন স্ন্যাল নেজেন্দ্রর বড় সন্তান। ‘ভূমির অধিকার রক্ষা’য় গিয়েছিলেন মিছিলে। খবর শুনে নেজেন্দ্রর কাঁপতে থাকা হাত থেকে কুঠার পড়ে যায়। পাশের ক্ষেত থেকে ছুটে আসেন পিরেনের মা, সাইলো স্ন্যাল (৫০)। তারা ছুটে যেতে চান প্রিয় সন্তানের কাছে। খবর আসে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়েছে টাঙ্গাইল সদর হাসপাতালে। পিরেন পরদিন ফেরেন নিজের বসতভিটায়, যে জমির অধিকার রক্ষায় তাকে রক্ত দিতে হয়েছে।

২০০৪ সালের ৩ জানুয়ারির ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মধুপুর বনকে ঘিরে উন্নয়নের নামে নেওয়া প্রকল্পের বিরুদ্ধে আন্দোলন তীব্রতা পায়। বন রক্ষার নামে বন বিভাগ বনের চারপাশে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করার উদ্যোগ নিয়েছিল। এতে এ বনেই যুগ যুগ ধরে বাস করা নৃ-গোষ্ঠী গারো-কোচ সম্প্রদায় আবাস হারানোর শঙ্কায় পড়েছিল। বন বিভাগের অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তারা প্রতিবাদ গড়ে তোলে। রক্তাক্ত আন্দোলনের পর বন বিভাগ উদ্যোগটি আপাতত স্থগিত রাখে। কিন্তু এই রক্তের বলিদানও জমিতে স্ন্যাল পরিবারের উত্তর পুরুষের অধিকারের স্বীকৃতি দিতে পারেনি। আজও সাইলো-নেজেন্দ্রদের রাত কাটে নিজ বসত থেকে উচ্ছেদের আতঙ্ক নিয়ে। কারণ বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় এ এলাকার নয় হাজার ১৪৫ একর জমিকে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করেছে, যার মধ্যে বসতভিটা, কৃষিজমিসহ দুই হাজার একর জমি রয়েছে গারো ও কোচ সম্প্রদায়ের। পিরেন স্ন্যালদের জমিও এর আওতায় পড়েছে। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি এক সরকারি প্রজ্ঞাপনে এ ঘোষণা আসে। এর পরই গেজেটের আওতাভুক্ত ১৩ গ্রামের গারো ও কোচ নৃ-গোষ্ঠীর এক হাজার ৮৩ পরিবারের ছয় হাজার অধিবাসীর মনে আবারও উচ্ছেদ আতঙ্ক ভর করে।

ঘোষিত সংরক্ষিত বন এলাকার অন্তর্ভুক্ত গ্রামগুলো হচ্ছে- গায়রা, জলই, টেলকী, সাধুপাড়া, জালাবাদা, কাকড়াগুনি, বেদুরিয়া, জয়নাগাছা, বন্দরিয়া, কেজাই, পনামারী, আমলীতলা ও গাছাবাড়ী। এ গ্রামগুলো শোলাকুড়ি ও অরণখোলা ইউনিয়নে পড়েছে।

গত ২১ জুলাই বিকেলে মধুপুর জাতীয় উদ্যানের পিচঢালা পথ ধরে যাওয়া হয় পিরেন স্ন্যালদের বাড়িতে। পথের দু’ধারে কখনও আনারসের ক্ষেত, কখনো কলার বাগান দেখা যায়। আর হঠাৎ করে উঁকি দেওয়ার মতো চোখে পড়ে এখনও টিকে থাকা গড় বনাঞ্চলের কিছু অংশ। পিরেনদের বাড়ি যেতে যেতে গোধূলি পেরিয়ে সন্ধ্যা নামে। পথেই স্থানীয় বিদ্যালয়ের পাশেই পিরেন স্ন্যালের সমাধি। সেখানে কিছু সময় কাটিয়ে পিরেনদের বাড়িতে যাওয়া হয়। উঠোনে সাংসারিক কাজে ব্যস্ত ছিলেন সাইলো স্ন্যাল। ক্ষেতের কাজ থেকে তখনও ফেরেননি নেজেন্দ্র নকরেক। সাইলো মাতৃভাষা গারো ছাড়া অন্য ভাষা না জানায় তার ছোট ছেলে জিনেন্দ্রের মাধ্যমে কথা হয়। পিরেনের বিষয়ে জানতে চাইলে সাইলো বলেন, ‘চৌদ্দ পুরুষের ভূমি বাঁচানোর জন্য ছেলে জীবন দিয়েছে। সে খুব সাহসী ছিল।’ এ সময় ক্লান্ত দেহে ক্ষেত থেকে ফেরেন নেজেন্দ্র। বাড়িতে দুটো কুঁড়েঘর। এর একটির মাটির বারান্দায় বসেই কথা হয় নেজেন্দ্রর সঙ্গে। শুনতে চাইলে তিনি সেদিনের (পিরেনের নিহত হওয়ার দিনের) ঘটনা বলতে থাকেন। ভাঙা ভাঙা বাংলা উচ্চারণে টুকরো ঘটনাগুলো জীবন্ত হয়ে উঠছিল উপস্থিত শ্রোতাদের কাছে। কুপির হালকা আলোয় লুকিয়ে পড়ছিল নেজেন্দ্রর চোখের জল। পাশেই বসে থাকা সাইলো স্বামীর কথার মাঝে প্রায়ই গারো ভাষায় বিড়বিড় করে কী যেন বলছিলেন, হয়তো ছেলের স্মৃতি ফিরে আসছিল তার মনে। সরকার নতুন করে সংরক্ষিত বনের ঘোষণা দিয়েছে- এমন কথা বলার পর পিরেনের বৃদ্ধ বাবা ধরা গলায় বলেন, ছেলে চলে গেছে। বিনিময়ে টাকা-পয়সা চাই না। নিজেদের বাড়িতেই যেন বাকি জীবন কাটাতে পারি এটাই চাওয়া।

গত ২১ ও ২২ জুলাই গেজেটের আওতাভুক্ত গায়রা, কাকড়াগুনি, বেদুরিয়া, জয়নাগাছা, কেজাইসহ কয়েকটি আদিবাসী গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি পরিবারেই জমি হারানোর এ শঙ্কা। বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের পূর্বপুরুষরা যুগ যুগ ধরে এ বনকে কেন্দ্র করেই গ্রামগুলো গড়ে তুলেছেন। এ বনই তাদের জীবন ও জীবিকার উৎস। বার বার তাদের জীবনমূলেই আঘাত আসছে। লড়াই করেই তারা টিকে আছেন এ গড় অঞ্চলে। এবারও সরকার তার ঘোষণা প্রত্যাহার না করলে আবারও নিজেদের ঐতিহ্য রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। কারণ এ ভূমিই তাদের ইতিহাস।

জ্যোতি নকরেক গায়রা স্কুল মাঠের পাশে চায়ের দোকান নিয়ে বসেছেন। ২২ জুলাই দুপুরে তার হাতে বানানো চা পান করতে করতে জিজ্ঞেস করি, সংরক্ষিত বনের জন্য সরকার জোর করে জমি নিয়ে নিলে কোথায় যাবেন? জ্বলতে থাকা চুলোর গনগনে আগুনের মতোই ক্ষোভমিশ্রিত কণ্ঠে বলে ওঠেন, বাপ-দাদার (আসলে মা-নানি-গারোরা মাতৃতান্ত্রিক পরিবার) বসতভিটা ছেড়ে কোথাও যাবেন না। প্রয়োজনে লড়াই করবেন, জীবন দেবেন। তবু ভূমির অধিকার ছাড়বেন না। তিন ছেলে ও এক মেয়ের মা এই নারীর সংগ্রামী বলিরেখায় তখন ফুটে উঠেছিল লড়াইয়ের দৃঢ় সংকল্পের লেখচিত্র। জ্যোতি নকরেকের পরিবারের সদস্য এখন ছয়জন। সেদিন বিকেলেই পঁচিশমাইল বাজারে বসে কথা হয় কেজাই গ্রামের বাসিন্দা এটিং সাংমার সঙ্গে। ৪৩ বছর বয়সী এ আদিবাসী বলতে থাকেন তদের দুঃখগাথা। এ বন তাদের খাবার ও বেঁচে থাকার উৎস উল্লেখ করে এটিং সাংমা বলেন, এখান থেকে অন্য কোথাও গেলে তাদের আত্মা মরে যাবে। দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে এটিং সাংমার রয়েছে আট বিঘার মতো জমি, যাতে আনারস, আদা ও ধান চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।

পাশের কাকড়াগুনী গ্রামের বাসিন্দা প্রমথ মারাক। ৭০ বছর বয়সী এ প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধার জীবনের গল্প শুনি গায়রা স্কুলমাঠে বসে। দুপুরের তপ্ত রোদে রুক্ষ মাঠের মতোই শুষ্ক মনে তিনি জানান, যুবক বয়সে জীবন বাজি রেখে মাতৃভূমির জন্য লড়াই করেছেন। জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে এখন নিজের জন্মভিটা থেকে উচ্ছেদ হতে চলেছেন। মেঘালয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে ১১ নম্বর সেক্টরের হয়ে জামালপুর-শেরপুরের রণাঙ্গনে লড়েছেন এই আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা। চার মেয়ে, তিন ছেলের জনক প্রমথ মারাকের পাঁচ একর জমি রয়েছে।

শুধু ১৩ গ্রাম নয় আশপাশের ৭০ গ্রামের অধিবাসীরা এমন আতঙ্কে ভোগেন। কারণ তাদের জমি-বসতভিটা নতুন গেজেটের আওতায় না হলেও ১৯৮৪ সালের গেজেটের আওতায় পড়েছে। ফলে ভবিষ্যতে সরকার যদি সংরক্ষিত বনের আওতা বাড়ায় তাহলে এসব গ্রামও স্থানান্তরের প্রয়োজন পড়বে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here