আটলান্টিক সিটির প্রবাসী বাংলাদেশীদের আনন্দ ভ্রমণ

0
121

07202016_03_ATLANTIC_CITYআটলান্টিক সিটি থেকে:- এগারো জুলাই,সোমবার ,ঘড়ির কাঁটা তখন প্রায় মধ্যরাত ছুঁই ছুঁই,আটলান্টিক সিটির প্রবাসী বাংলাদেশীদের পদচারনায় মুখর ফ্লোরিডা এভিনিউর খোলা প্রান্তর, তাদের কলকাকলিতে রাতের নীরবতা ভেঙ্গে খান খান হবার উপক্রম, নির্দিষ্ট সময়ের বেশ কিছু পরে আনন্দযানের চাকা সচল হতেই ভ্রমণ পিপাসুদের আনন্দ- উচ্ছ্বাস আর দেখে কে? আনন্দ যানের ভেতরে যেন তখন প্রাণের খুশির জোয়ার জেগেছে। আর খুশির জোয়ার জাগবেই বা না কেন? প্রবাস জীবনের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম শেষে এই আনন্দ অবসরের জন্যই তো সবাই মুখিয়ে থাকে, মন চায় আনন্দ ভ্রমণে যেতে।আর সেই আনন্দ ভ্রমণের আয়োজক স্থানীয় গীতা সংঘ।তাদের বার্ষিক এই আয়োজনের সর্বশেষ গন্তব্য সুদূর কানাডার টরেন্টো শহর।

হাইওয়েতে উঠতেই আনন্দযানের চাকার গতি বাড়ে,তার সংগে পাল্লা দিয়ে কমে আসে ভ্রমণ পিপাসুদের আনন্দ- উচ্ছ্বাসের মাএা।প্রকৃতির নিয়মে সবাই একে একে ঢলে পড়ে নিদ্রা দেবীর কোলে।আনন্দযান এগিয়ে চলে,সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে এক সময় আনন্দযান এসে থামে কানাডার নির্দিষ্ট আবাসস্থলে।ভ্রমণ ক্লান্ত ভ্রমন পিপাসুরা যার যার কক্ষে ঢুকে ক্লান্ত দেহটাকে মেলে দেয় মখমলের বিছানায়। ক্লান্তি- শ্রান্তি নিবারন শেষে নির্দিষ্ট সময়ে সবাই বেরিয়ে আসে,মধ্যাহ্ন ভোজ সেরে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে তুলতে সবার পদযুগল সচল হয় নায়াগ্রা ফলসের পানে ।

পথ চলতে চলতে ভ্রমণ পিপাসুদের কর্ণ কুহরে ভেসে আসে নায়াগ্রা ফলসের উত্তাল জলরাশির সুতীব্র কলরব।আর তা শুনে ভ্রমণ পিপাসুদের মনে হয় নায়াগ্রা ফলস যেন তাদের এই বলে আবাহন করছে ,’ আমার ভূবনে স্বাগতম। এসো, আমার অফুরন্ত রূপের ভাণ্ডার উপভোগ করো’ । আর সেই আবাহনে সাড়া দিয়ে ভ্রমণ পিপাসুরা নায়াগ্রার পাড়ে দাঁড়িয়ে উপভোগ করতে থাকে তার অপরূপ রূপের আধার ।স্মৃতির ফ্রেমে তা ধরে রাখার নিমিত্তে ক্যামেরার শাটারে ঘন ঘন চাপ পড়ে। এবার নীচে নেমে ‘মেড অব দ্য মিষ্ট ‘ নামক জলযানে চড়ে খুব কাছ থেকে নায়াগ্রা ফলসের রূপ উপভোগের পালা।নায়াগ্রা জলপ্রপাতে প্রতি মিনিটে ছয় মিলিয়ন ঘনমিটার (কিউবেক) পানি আছড়ে পড়ছে নীচে নায়াগ্রা নদীতে।

দুপুরের তপ্ত সূর্যের তীব্র আলোক রশ্মি সেই জলধারার উপর পড়ে সৃষ্টি করে রংধনু। জলযানে চড়ে কাছ থেকে সেই রংধনুর রূপ উপভোগ করা সত্যিই অন্যরকম এক অনুভূতির সৃষ্টি করে। সৃষ্টির সে কী অপার বিস্ময়! জলপ্রপাতের জলের ধারায় সৃষ্টি হওয়া রংধনুর সাত রং দেখে মনে হয় যেন সফেদ জলরাশির শ্বেতশুভ্র আকাশে মেঘরাজির রংয়ের খেলা।আর সেই রংয়ের খেলা দেখতে দেখতে ওপর থেকে সুতীব্র বেগে ধেয়ে আসা জলের ছাঁট তপ্ত শরীরে বুলিয়ে দেয় হিমশীতল পরশ, সে এক অন্যরকম অনুভূতি।সৃষ্টির অপার রূপসুধা উপভোগ করতে করতে কখন যে জলযান এসে জেটিতে ভিড়েছে সেদিকে কারো খেয়ালই নেই।জলযান থেকে কারোর যেন নামারই ইচ্ছে নেই,মন যে কিছুতেই সায় দেয় না জলযান থেকে নামতে।নিয়ম মেনে নামতেই হয় এক সময় ।জলযান থেকে নেমে উপরে উঠতেই হরেক রকমের স্যুভেনিরের সমারোহে বিশাল এক বিপণী, বিপনীর বাইরে খোলা মঞ্চে লাইভ মিউজিক। এসব তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ শেষে বাইরে বেরিয়ে আসে সবাই, সূর্য দেবতার তেজও ততক্ষণে কমে এসেছে,পদব্রজে নায়াগ্রা শহর ঘুরে ফিরে দেখে আবার ডেরায় ফিরে আসা। রাতে নৈশভোজ সেরে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যাওয়া।

তেরোই জুলাই, বুধবার। প্রাতঃরাশ সেরে আনন্দযানে চড়ে বসতেই তা ছুটতে শুরু করে টরেন্টোর উদ্দেশ্যে।পথে যেতে যেতে রাস্তার দু’পাশের রূপ উপভোগ করতে করতে হঠাৎ দূর থেকে দৃষ্টে আসে টরেন্টো শহরের স্কাইলাইন ,
সুউচ্চ ভবনের ফাঁক গলে উঁকি মারে টরেন্টোর র্গব সিএন টাওয়ারের চূড়া।টরেন্টো শহরের কাদা থিকথিক ভিড় পেরিয়ে স্থানীয় ইসকন মন্দিরে দুপুরের ভোজ গ্রহন শেষে আবার কাফেলার যাএা স্বামী নারায়ন মন্দিরের উদ্দেশ্যে। নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীর জন্য বিখ্যাত এই মন্দির দর্শন শেষে এবার যাএা সিএন টাওয়ারের উদ্দেশ্যে। সিএন টাওয়ারের কেন্দ্রস্থলে পৌঁছে সবাই ইতি-উতি ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন স্থাপনা দর্শনে। কেউ কেউ চড়ে বসে সিএন টাওয়ারের সুউচ্চ চূড়ায়।সেই চূড়ায় উঠে টরেন্টো শহরের রূপসুধা উপভোগ করে অনেকেই মোহিত হয়ে পড়ে।এরপর নৈশভোজ সেরে আবার ডেরায় ফেরা, ফিরতে ফিরতে ঘড়ির কাঁটা তখন মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে।

চৌদ্দই জুলাই, বৃহস্পতিবার,সকাল বেলা নিদ টুটতেই ভ্রমণ পিপাসুদের কেউ কেউ ছোটে সুইমিং পুলের উদ্দেশ্যে, পুলের নীলাভ জলে জলকেলি করে কেউ কেউ তপ্ত শরীরের জ্বালা জুড়িয়ে নেয়। এবার বিদায়ের পালা।নির্দিষ্ট সময়ে আনন্দযানের চাকা সচল হয়। কানাডা সীমান্ত পেরিয়ে ইউএসএ সীমান্তে ঢুকতেই কারো যেন তর সয় না ইউএসএ প্রান্তের নায়াগ্রা ফলস দেখার।আনন্দযান এসে থামতেই সবাই হুড়মুড়িয়ে নেমে পড়ে, হন্তদন্ত হয়ে ছোটে নায়াগ্রা জলপ্রপাতের পানে।জলপ্রপাতের কাছাকাছি পৌঁছে রেলিং এ ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ভ্রমন পিপাসুরা উপভোগ করতে থাকে সুতীব্র বেগে ধেয়ে আসা জলরাশির তীব্র স্রোতধারা যা জলপ্রপাতের আকারে গড়িয়ে পড়ছে নীচে, মেঘলা আবহাওয়ায় তা অন্যরকম এক রূপের সৃষ্টি করেছে।আর তা দেখে মনের আনন্দে নিজের অজান্তে মন গুনগুনিয়ে ওঠে, ‘ ওহে সুন্দর মরি মরি……।।’

এবার ফেরার পালা।নির্দিষ্ট সময়ে আনন্দযান সচল হতেই ভ্রমণপিপাসুরা মেতে ওঠে বিভিন্ন রকম আনন্দ আয়োজনে। আনন্দযজ্ঞে মেতে থাকতে থাকতে কমতে থাকে পথের দুরুত্ব,এক সময় আনন্দযানের চাকা যায় থেমে।দিন কয়েকের আনন্দ ভ্রমনের সুখ স্মৃতি নিয়ে আয়োজকদের ধন্যবাদে সিক্ত করে ভ্রমন পিপাসুরা পা বাড়ায় নিজের ডেরার উদ্দেশ্যে,রাত তখন প্রায় নিশুতি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here