অলংকারিক, তবু রাষ্ট্রপতি পদ নিয়ে রাজনীতি কেন?

0
90

ঢাকা: নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে বৃহস্পতিবার। তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ২১তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা হবে।

বর্তমান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ২৩ এপ্রিল। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বিষয়ে সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, মেয়াদ অবসানের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ক্ষেত্রে মেয়াদ পূরণের আগের ৯০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। অর্থাৎ নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শেষ করতে হবে ২৪ জানুয়ারি থেকে ২৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে।

বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা খুব সীমিত। শর্তসাপেক্ষে তিনি নিজে থেকে শুধু দু’টি কাজ করতে পারেন, তা হলো প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ করা। এর বাইরে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া রাষ্ট্রপতি কিছুই করতে পারেন না।এমনকি বছরের শুরুতে রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদে যে ভাষণ দেন, সেই ভাষণও সরকার তৈরি করে দেয়।

কিন্তু একেবারেই অলংকারিক এই পদটির জন্য কাউকে নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনাকে কেন এত প্রাধান্য দেয়া হয়? রাজনৈতিক দলগুলোরই বা কেন এত আগ্রহ?

অন্যতম সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘সংবিধানে ক্ষমতা সীমিত হলেও রাষ্ট্রপতি অনেক সময় নৈতিক অবস্থান নিতে পারেন।’

কিন্তু আগে কাউকে সেরকম কোনো অবস্থান নিতে দেখা যায়নি। ২০০৬ সালে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন নিয়ে সংকটের সময় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজ উদ্দিন আহমেদের ভূমিকায় সংকট বরঞ্চ আরো ঘনীভূত হয়েছিল।

এরপরও বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান এবং বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করেছিলেন। কিন্তু সমস্যার বিন্দুমাত্র সমাধান হয়নি।

তাহলে এই পদটিকে এতটা গুরুত্ব কেন দেয় দলগুলো?

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম বলেন, রাষ্ট্রপতি এবং সরকারের মধ্যে সম্পর্ক খারাপ থাকলে সেটা দেশ পরিচালনায় প্রভাব পড়ে।

তিনি বলেন, ‘সাহাবুদ্দিন আহমদকে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগই রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছিল।ওই সময়টায় আমরা দেখেছি, এটি (প্রেসিডেন্ট পদটি) দলের বাইরে গেলে অসুবিধা হয়। রাষ্ট্রপতি এবং যে দল ক্ষমতায় থাকবে, তাদের মধ্যে যদি সমঝোতা বা বোঝাপড়া না থাকে, তাহলে ক্ষমতার অপপ্রয়োগ হতে পারে… বিষয়টা সরকারের জন্য আমি বলবো বাঞ্ছনীয় নয়।’

২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় এসে তাদের দল থেকেই অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করেছিলো। কিন্তু তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কবর জিয়ারত করার পর তারই দলের সরকারের সঙ্গে অধ্যাপক চৌধুরীর টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছিল।

সেটা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে সংসদে বিএনপির সংসদ সদস্যদের অভিশংসনের মুখে অধ্যাপক চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি পদ হারাতে হয়েছিল।

এর আগে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ নির্দলীয় ব্যক্তি হিসেবে বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেছিল। তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর জননিরাপত্তা আইন নামের একটি বিতর্কিত আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সই করেননি। সে কারণে তার সঙ্গে তৎকালীন সরকার এবং আওয়ামী লীগের তিক্ততা তৈরি হয়েছিল। তখন সেই সম্পর্কে আর উন্নতি হয়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী মনে করেন, যেহেতু অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির নৈতিক অবস্থান নেয়ার সুযোগ আছে, সে কারণে এই পদে নির্বাচনের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনরা দলের প্রতি অনুগত ব্যক্তির বাইরে বেরুতে পারছে না।

তর মতে, ‘বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ এবং অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী রাষ্ট্রপতি থাকার সময় আইনের ভেতরে থেকেই একটা স্পেস তৈরি করতে চেয়েছিলেন।কিন্তু তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলগুলো সেটুকুও সহ্য করতে পারেনি।জাতীয় কোনো সংকটে কিন্তু রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব হয়ে যায়, সেই সংকটে ভূমিকা রাখার। আমাদের দলগুলোর যে সংস্কৃতি, তারা সে রকম ব্যক্তিকে ওই পদে চায় না। সূত্র: বিবিসি বাংলা