অরাজনৈতিক ধর্মীয় সংগঠনের রাজনীতি, ‘তিন দল থেকেই সুবিধা নিচ্ছে হেফাজত’

0
91

hefazat-e-islam_292673চট্টগ্রাম: চার বছর আগে ঢাকার শাপলা চত্বরে হঠকারী সমাবেশের পর কোণঠাসা হয়ে পড়া হেফাজতে ইসলাম ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। সরাসরি রাজনীতিতে না এলেও দেশের প্রধান তিন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে এক ধরনের সমঝোতা করে সুবিধা নিচ্ছে তারা। সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে হেফাজতকে কাছে টানছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির মতো রাজনৈতিক দল।

তিন প্রধান দলের সঙ্গেই হেফাজতের যোগাযোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নেতারা দায়িত্ব ভাগ করে পরিকল্পিতভাবে তা করছেন। জানা গেছে, নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা সামাল দেওয়া ও কওমি মাদ্রাসার সনদ-সংক্রান্ত বিষয়ে হেফাজতপ্রধান আহমদ শফী নিজে সরকার ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তার ছেলে আনাছ মাদানী যোগাযোগ রাখছেন বিএনপির সঙ্গে। আর জাতীয় পার্টির সঙ্গে সম্পর্ক রাখছেন সংগঠনের মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরী।

২০১৩ সালের ৫ মে ১৩ দফা দাবিতে কওমি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের নিয়ে ঢাকা ঘেরাও ও মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশকে কেন্দ্র করে হেফাজত সহিংস তাণ্ডব সৃষ্টি করে। পরে অবৈধভাবে লাগাতার অবস্থানের চেষ্টা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নস্যাৎ করে দেয়। ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোর গতি স্তিমিত রেখে আওয়ামী লীগ ক্রমে হেফাজত নেতাদের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করে। কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ দাওরায়ে হাদিস সনদকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর মর্যাদায়

সরকারি স্বীকৃতি দিয়ে ভাঙা সম্পর্ক জোড়া লাগিয়েছে ক্ষমতাসীন দল। হেফাজতের একটি বড় অংশ এখন আওয়ামী লীগের প্রশংসায় বক্তব্য দিচ্ছে।

হেফাজতের আরও দুটি অংশ কৌশলে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে বিএনপি ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে। অতি সম্প্রতি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মীর নাছির গিয়ে দেখা করে আসেন হেফাজত আমির আহমদ শফীর সঙ্গে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন আহমদ শফীর ছেলে মাওলানা আনাছ মাদানী। জাতীয় পার্টির হয়ে যোগাযোগ রক্ষা করছেন হাটহাজারীর সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরের ঘটনার পর জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নিজে এসে দেখা করে গেছেন আহমদ শফীর সঙ্গে। তখন উপস্থিত ছিলেন হেফাজতের মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরী।

হেফাজতে রাজনৈতিক নেতা :হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ এক নেতা জানান, অরাজনৈতিক সংগঠন হলেও এতে নীতিনির্ধারক স্তরে আছেন কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা। তারা আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে যুক্ত আছেন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে আছেন খেলাফত মজলিসের মাওলানা ইসহাক। তিনি হেফাজতের একজন নীতিনির্ধারক। কোনো জোটে না থাকলেও হেফাজতের ঢাকা বিভাগের নায়েবে আমির মাওলানা হাফেজ আতাউল্লাহ নেতৃত্ব দিচ্ছেন খেলাফত আন্দোলন নামে রাজনৈতিক দলের।

আগে বিএনপি জোটের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটে যুক্ত হন হেফাজতের সাবেক নায়েবে আমির মুফতি ইজহার। তিনি নেজামে ইসলামী পার্টির সভাপতি। হেফাজতের সঙ্গে যুক্ত থাকা মাওলানা হাবিবুর রহমান নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের। এ সংগঠনের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক হেফাজত ঢাকা মহানগরীর নায়েবে আমির। ইসলামী ঐক্যজোটের মুফতি ফয়জুল্লাহ ও মাঈনুদ্দিন ব্রহী হেফাজতের নেতৃত্বেও আছেন। হেফাজতের ঢাকা মহানগরীর উপদেষ্টা মুফতি ওয়াক্কাছ নেতৃত্ব দিচ্ছেন জমিয়াতুল ওলামায়ে ইসলাম নামে রাজনৈতিক দলের। এরশাদ আমলে মন্ত্রী ছিলেন তিনি। হেফাজতের নেতা মাওলানা মুজিবুর রহমান যুক্তিবাদী সম্পৃক্ত ছিলেন জাতীয় পার্টির সঙ্গে। এরশাদের জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করলে পদত্যাগ করেন তিনি। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের প্রতি আনুগত্য আছে তার।

ভোট টানাই লক্ষ্য :হেফাজতের আমির মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, ‘আসন্ন নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর হবে হেফাজতে ইসলামের ভোটব্যাংক। এটি বুঝতে পেরে বড় রাজনৈতিক দলগুলো আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে। কিন্তু আমরা শত প্রলোভন উপেক্ষা করে রাজনীতি থেকে দূরে আছি। কোনো মুসলমান যদি আমাদের সঙ্গে দেখা করতে চায়, আমরা তাদের না করি না। কে কোন রাজনৈতিক দল করে, সেটি আমাদের বিবেচ্য বিষয়ও নয়।’

একসময় আওয়ামী লীগের প্রতি বিষোদ্গার করলেও এখন কেন শেখ হাসিনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হেফাজত_ এমন প্রশ্নের জবাবে ইসলামাবাদী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ৫০ লক্ষাধিক কওমি শিক্ষার্থীর স্বীকৃতি দিয়েছেন। এটি আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি। আমরা এ সিদ্ধান্তে খুশি হলেও আওয়ামী লীগের কাছে আত্মসমর্পণ করিনি। তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো চুক্তিও হয়নি।’

নরম আওয়ামী লীগ :কওমি সনদের স্বীকৃতি দেওয়ার পর সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে ভাস্কর্য সরানোর অনুকূলে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শাপলা চত্বরের ঘটনার পর সারাদেশে হেফাজত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলো নিষ্ক্রিয় রাখা হয়েছিল। সে সময় চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে গুজব ছড়িয়ে হাঙ্গামা সৃষ্টিতে ছয়জনের মৃত্যু হয়। মামলা হয়েছিল কেবল পুলিশের কাজে বাধা দেওয়া ও বিস্ফোরক আইনে। এ মামলায় ৫৩ জনের নাম উল্লেখ করে চার-পাঁচ হাজার অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হলেও এখন গ্রেফতার নেই কেউই। হত্যাকাণ্ডের কোনো ক্লুও গত চার বছরে উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। চিহ্নিত হয়নি নাশকতাকারীরাও।

দোয়া নেয় জাতীয় পার্টি :শাপলা চত্বরের ঘটনার কিছুদিন পর ২০১৩ সালের ১৭ নভেম্বর হাটহাজারী এসে আহমদ শফীর দোয়া নিয়ে গিয়েছিলেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তখন তার সঙ্গে ছিলেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও স্থানীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, সাবেক মন্ত্রী জিয়াউদ্দিন বাবলু ও নগর জাতীয় পার্টি নেতা সোলায়মান আলম শেঠ। আহমদ শফীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন হেফাজত মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরী।

চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে জাতীয় পার্টির বার্তা নিয়ে হাটহাজারী মাদ্রাসায় যান পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। এর আগে তিনি বলেছিলেন, তার সংসদীয় এলাকায় দারুল উলুম মাদ্রাসা। স্থানীয় এমপি হিসেবে তিনি স্বাভাবিকভাবে খোঁজখবর রাখেন। তবে গতকাল যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি।

উদ্বিগ্ন বিএনপি :আওয়ামী লীগের সঙ্গে হেফাজতের সখ্য বাড়ায় উদ্বিগ্ন বিএনপি নেতারা হেফাজতের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন। গত বছর ১৩ এপ্রিল হাটহাজারীর মাদ্রাসায় গিয়ে আহমদ শফীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাছিরউদ্দিন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক ও হাটহাজারী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলহাজ নুর মোহাম্মদ, সদস্য সচিব সোলাইমান মনজু, যুগ্ম আহ্বায়ক মুসলিম উদ্দিন, চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদল নেতা সালাউদ্দিন আলী প্রমুখ। ওই সাক্ষাতের উদ্দেশ্য ছিল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে হাটহাজারী উপজেলার বুড়িশ্চরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের মনোনীত এক প্রার্থীর পক্ষে হেফাজতের সমর্থন আদায়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কওমি সনদের স্বীকৃতি দেওয়ার পর আবারও বিএনপির বার্তা নিয়ে হেফাজতের কাছে ছুটে যান মীর নাছির। গত ৫ মে হাটহাজারী মাদ্রাসায় দেখা করেন তিনি। এ সময় হাটহাজারী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক নুর মোহাম্মদ, সদস্য সচিব সোলাইমান মনজু, যুগ্ম আহ্বায়ক মুসলিম উদ্দিন, চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদল নেতা সালাউদ্দিন আলী, হাটহাজারী উপজেলা শ্রমিক দল সভাপতি ম