অপারেশন স্টর্মে নিহত ৯ জঙ্গি

0
284

image-28026আবুল কালাম ,ঢাকা থেকে: রাজধানীর কল্যাণপুরের বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন ৫ নম্বর সড়কের জাহাজ বিল্ডিংয়ে গড়ে ওঠা ‘জঙ্গি আস্তানা’য় পুলিশের ঘণ্টাব্যাপী রুদ্ধশ্বাস অভিযানে ৯ জঙ্গি নিহত হয়েছে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রাকিবুল হাসান ওরফে রিগ্যান নামে অপর এক জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পালিয়ে গেছে আরেক জঙ্গি। পুলিশের দাবি, ৬তলা ওই বাড়ির ৫ম তলার বাসাটি ‘জঙ্গি আস্তানা’ হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছিল। হতাহত জঙ্গিদের সবাই নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সদস্য।

‘অপারেশন স্টর্ম টোয়েন্টি সিক্স’ নামে পরিচালিত এ অভিযানে অংশ নেয় ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটি) সোয়াট টিম, বম্ব ডিসপোজাল টিম, গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), সিআইডির ফরেনসিক টিম, র‌্যাব ও ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার কর্মীরা। গতকাল মঙ্গলবার ভোর ৫টা ৫১ মিনিট থেকে ৬টা ৫১ মিনিট পর্যন্ত ঘণ্টাব্যাপী চলে শ্বাসরুদ্ধকর এ অভিযান। মুহুর্মুহু গুলি আর হাতবোমার বিস্ফোরণে আশপাশের বাড়ির বাসিন্দাদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ বলছে, জঙ্গিদের সবার বয়স ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে।

তাদের বয়স, পোশাক, চেহারা, অবয়ব, চালচলন ও কথা বলার ধরন সবকিছু মিলে মনে হয়েছে তারা উচ্চবিত্ত শ্রেণির। গুলশান হামলায় অংশগ্রহণকারী গ্রুপের সঙ্গে এই গ্রুপের যোগসূত্র রয়েছে। নিহত ৯ জঙ্গির মধ্যে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীও রয়েছে বলে পুলিশের কাছে প্রাথমিক তদন্তে প্রতীয়মান হয়। তবে ৯ জনের মধ্যে কে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তা খোলসা করেনি পুলিশ। পুলিশ এও বলছে, রাজধানীতে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা নিয়ে ১১ জঙ্গি ওই বাসা ভাড়া নেয় গত ১২ জুলাই। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ১৩টি তাজা গ্রেনেড, ৪-৫ কেজি জেল পাউডার, ১৯টি ডেটোনেটর, ৪টি পিস্তল, ৭টি ম্যাগাজিন, ২২টি গুলি, একটি তলোয়ার, ৩টি কমান্ডো চাকু, ১২টি গেরিলা চাকু, বালির বস্তা, ও ‘আল্লাহু আকবর’ লেখা দুটি কালো পতাকা উদ্ধার করেছে। ৯ জঙ্গির লাশের ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠিয়েছে পুলিশ। সেখানে আজ তাদের লাশের ময়নাতদন্ত করা হবে।

এই ৯ জঙ্গিরও মরদেহ থেকে ডিএনএ ও ভিসেরা পরীক্ষার জন্য আলামতের নমুনা সংগ্রহ করা হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে। ঘটনার শুরু সোমবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে। মিরপুর এলাকায় জঙ্গি আস্তানার খোঁজে ওই রাতে ‘ব্লক রেইড’ দেয় পুলিশের মিরপুর অপরাধ বিভাগ। মিরপুর থানা পুলিশের একটি দল ৫৩ নম্বরের তাজ মঞ্জিলের তৃতীয় তলা পর্যন্ত ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ওপর থেকে পুলিশকে লক্ষ করে হাতবোমা নিক্ষেপ করে জঙ্গিরা। এতে এক পুলিশ সদস্য আহত হন। এর পরপর সিটি, ডিবি, সোয়াটসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। মূল অভিযানের জন্য ভোরের আলোর অপেক্ষা শুরু হয়। ৫টা ৫১ মিনিটে শুরু হয় ‘অপারেশন স্টর্ম টোয়েন্টি সিক্স’।

পুলিশের গুলিতে মারা পড়ে ৯ জঙ্গি। গুলি আর হাতবোমার শব্দে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এর আগেই ওই ভবনের বেশিরভাগ বাসিন্দাকে বের করে আনে পুলিশ। রাত সাড়ে ১২টায় তাজ মঞ্জিলে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে দুই জঙ্গি লাফ দিয়ে পার্শ্ববর্তী আরেকটি বাড়ির টিনের চালায় গিয়ে পড়ে। এ সময় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয় রাকিবুল হাসান ওরফে রিগ্যান নামে একজন। আরেকজন পালিয়ে যায়। পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, নিহত ৯ জঙ্গির মধ্যে ৮ জনের নাম জানিয়েছে হাসান। তারা হলো রবিন, অভি, আতিক, সোহান, ইকবাল, তাপস, ইকবাল ও সাব্বির। হাসান নিজেকে আইএস সদস্য বলে দাবিও করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশের ওই সূত্র। পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে তারা মনে করছেন নিহত জঙ্গিদের মধ্যে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রও রয়েছে।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, হাসান যে নামগুলো বলেছে, তা পারিবারিক পরিচয় হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এগুলো সাংগঠনিক ছদ্মনাম হতে পারে। সকাল ৬টা ৫১ মিনিটে অভিযান শেষ হওয়ার পর সাড়ে ৮টার দিকে ওই বাসায় প্রবেশ করেন সিআইডির ক্রাইম সিন বিভাগের সদস্যরা। তারা ঘটনাস্থলের ছবি তোলে। এ ছাড়া বিভিন্ন আলামত জব্দ করে। নিহত জঙ্গিদের সবার পরনে ছিল কালো জায়জামা-পাঞ্জাবি। সিঁড়ি এবং ওই ফ্ল্যাটের মেঝেতে ছিল রক্তের ছোপ-ছোপ দাগ। ওই ফ্ল্যাটে আসবাব তেমন কিছু ছিল না। জঙ্গিরা মেঝেতেই ঘুমাত। পুলিশ জানায়, নিহতদের মধ্যে ৭ জনের লাশ পাওয়া গেছে পঞ্চম তলার করিডরে, দুজনের লাশ ছিল দুটি কক্ষে। জাহাজ বাড়ির ৬তলায় ৯ তরুণ মেস করে থাকত। অভিযানের রাতে দুজন তাদের আত্মীর বাড়িতে বেড়াতে যায়। অভিযানের সময় বাসার ভেতরেই থেকে যায় বাকি ৭ জন।

তাদেরই একজন শ্যামলী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র আবু সায়েম। সায়েম তার চাচাতো ভাই মতিউর রহমানকে মোবাইল ফোনে জানায়, রাতে প্রথমে তারা তিনটি গুলির শব্দ শুনতে পায়। প্রথমে তারা ভেবেছিল পাশের বিল্ডিংয়ে এসব হচ্ছে। এরপর প্রচ- গোলাগুলি শুরু হয়। এ সময় নিজেরা আতঙ্কে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে রাখে। তখন তার মনে হচ্ছিল, তারাও মারা যাবে। গতকাল দুপুর দেড়টার দিকে সায়েম ফের মতিউরকে মোবাইলে খুদে বার্তা পাঠিয়ে জানায়, তাদের পুলিশ হেফাজতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এরপর থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন মতিউর। তাজ মঞ্জিলের বাড়ির মালিক সাবেক কাস্টমস কর্মকর্তা আতাহার উদ্দিন। বর্তমানে তার ছেলে জুয়েল হোসেনই সব দেখাশোনা করেন। জুয়েলের কাছ থেকেই ১২ জুলাই ৫তলার বাসাটি ভাড়া নেয় ৪ তরুণ। পরে অন্য তরুণরা ওই বাসায় ওঠেন।

বাড়ির মালিক অ্যাডভোকেট জুয়েল ঈদের আগে আমেরিকা থেকে দেশে ফিরে আসেন। পুলিশের নির্দেশনা মেনে ভাড়াটিয়াদের তথ্য দেয়নি তারা। এ ঘটনায় অ্যাডভোকেট জুয়েল ও তার মা মমতাজ বেগম এবং বাড়ির কেয়ারটেকারসহ প্রায় ৪০ জনকে জিজ্ঞসাবাদের জন্য আটক করেছে মিরপুর থানা পুলিশ। ওই বাড়ির একজন সাবেক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করে এই প্রতিবেদককে বলেন, বাড়িটির বেশিরভাগ ভাড়াটিয়া ব্যাচেলর। বাসাটির ভেতরটা গুমোট হওয়ায় দিনের বেলাতেও আলো জ্বেলে রাখতে হতো। এ কারণে ভাড়াটিয়ারাও বেশিদিন থাকেন না সেখানে। সাদা এবং খয়েরি রঙের মিশেলে নির্মাণ করা বাড়িটি দেখতে জাহাজ আকৃতির। তাই এলাকার সবাই এটিকে জাহাজ বাড়ি নামেই চিনতেন। শিউলি আক্তার নামে এক প্রতিবেশী আমাদের সময়কে বলেন, একটানা প্রচ- গোলাগুলির শব্দ পেয়েছি আমরা। ভয়ে কেউ বাসা থেকে বের হয়নি। নিহত জঙ্গিদের বাইরে কখনো দেখেননি বলে জানান তিনি।

গতকাল সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, সরু গলিপথের ওই জাহাজ বাড়িতে প্রবেশের অন্তত ২০০ গজজুড়ে পুলিশ ঘিরে রেখেছে। এ ছাড়া এলাকাজুড়েই মোতায়েন করা হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। অভিযান ও নিরাপত্তার কারণে আশপাশের এলাকার প্রায় ২৭টি স্কুল-কলেজ বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। স্কুলের উদ্দেশে বের হলেও উদ্বিগ্ন হয়ে বাড়িতে ফিরতে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের। অভিযান শেষে সকাল ৮টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহীদুল হক। এ সময় তিনি বলেন, নিহত ব্যক্তিরা নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবি সদস্য। ওই বাড়ি থেকে গুলশানের মতো বড় হামলার পরিকল্পনার তথ্য পুলিশের কাছে আগে থেকেই ছিল।

গতকাল বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে কল্যাণপুরের ওই জঙ্গি আস্তানা থেকে জঙ্গিদের লাশ ময়না তদন্তের জন্য ৪টি অ্যাম্বুলেন্সে করে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে। এ ঘটনায় নিহত জঙ্গিদের ময়নাতদন্তে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. সোহেল মাহমুদ বলেন, প্রয়োজনীয় কাগজ-পত্রের অভাবে ময়নাতদন্ত শুরু করা যায়নি। কাল (আজ) সকালেই ময়না তদন্ত শুরু হবে। ওই বাড়ির পাশেই দীন কেজি স্কুল। স্কুলের এক শিক্ষক রাতে সেখানেই থাকেন। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, রাতে গোলাগুলির প্রচ- শব্দ শোনা যায়। নিরাপত্তাজনিত কারণে স্কুল বন্ধ রেখেছেন বলে জানান তিনি।

অভিযানের পরপর ডিএমপি অতিরিক্ত কমিশনার শেখ মারুফ হাসান ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের জানান, সোমবার মধ্যরাতের পর পুলিশ ও র‌্যাবের প্রাথমিক অভিযান শুরু হয়। পরে সোয়াট টিমের নেতৃত্বে ‘অপারেশন স্টর্ম টোয়েন্টি সিক্স’ নামে মূল অভিযান চলে। এর আগে গত ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে। জঙ্গিরা সেখানে ১৭ বিদেশিসহ ২০ জিম্মিকে গুলি ও গলা কেটে হত্যা করে। পরের দিন সকালে যৌথ বাহিনীর কমান্ডো অভিযানে ৫ জঙ্গি ও এক সন্দেহভাজন নিহত হয়। হলি আর্টিজানের অভিযানের শুরুতেই দুই পুলিশ কর্মকর্তা প্রাণ হারান। তবে কল্যাণপুরে পুলিশ বা অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যের রক্তক্ষয় ছাড়াই অভিযান শেষ করা হয়। হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর ঈদের দিন কিশোরগঞ্জের শোলকিয়ায় জঙ্গি হামলা চালানো হয়। সেখানে দুই পুলিশ সদস্য ও এক জঙ্গি মারা যায়। এ ছাড়া এক জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-পুলিশ।