অনুমোদন পেল এমএনপি: কার্যকর সেপ্টেম্বরে

0
111

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে মোবাইল নম্বর অপরিবর্তিত রেখে অপারেটর বদলের সুবিধা বা মোবাইল নাম্বার পোর্টেবিলিটি (এমএনপি) সেবা চালু করতে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা এমএনপি লাইসেন্স দেয়ার আনুষ্ঠানিকতা শুরু করতে পারবে। বুধবার ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব এম. রায়হান আখতার জানিয়েছেন, দেশের বাইরে যাওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী এমএনপির চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছেন। এখন এটি বিটিআরসিতে পাঠানো হবে। তারা এরপর বিটিআরসি এমএনপি সেবার কাজ দিতে নিলামের প্রস্তুতি নেবে। এদিকে টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বুধবার তাঁর ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে জানিয়েছেন, আগামী সেপ্টেম্বর মাসেই এমএনপি সেবা চালু হচ্ছে।

মোবাইল ফোন নম্বর অপরিবর্তিত রেখে অপারেটর বদলের পরিষেবা স্বচ্ছ করতে কয়েকটি মূল্যায়ন মানদণ্ড যুক্ত করে গত জানুয়ারিতে এমএনপি নীতিমালার সংশোধিত খসড়া চূড়ান্ত করে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি। এরপর তা পাঠানো হয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংশোধিত খসড়া নীতিমালার কোন পরিবর্তন ছাড়াই অনুমোদন করেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।

অপারেটর পরিবর্তনের এই বিধান বাংলাদেশ ছাড়াও বিভিন্ন দেশে চালু রয়েছে। নতুন এই নীতিমালায় কোন গ্রাহক ইচ্ছে করলেই তার মোবাইল নম্বর অপরিবর্তিত রেখে তার পছন্দমতো অপারেটরে যেতে পারবেন। আবার প্রয়োজনে আগের অপারেটরে ফিরেও আসতে পারবেন। এজন্য তাকে কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে। নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে, এই সুবিধা দিতে অপারেটররা গ্রাহকদের কাছ থেকে ৩০ টাকা নিতে পারবে। বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয় আগেই অনুমোদন করেছে। একবার এমএনপি সুবিধা নেয়ার পর গ্রাহক আবার নতুন কোন অপারেটরে যেতে চাইলে তাকে ৪৫ দিন অপেক্ষা করতে হবে। বর্তমানে ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশ ছাড়াও প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানে মোবাইল নম্বর পোর্টেবিলিটি বা এমএনপি পরিষেবা চালু রয়েছে।

নম্বর অপরিবর্তিত রেখে অপারেটর পরিবর্তনের এই নীতিমালায় বলা হয়েছে, এমএনপি পরিচালনার অভিজ্ঞতা, টেকনিক্যাল ও সিস্টেম ডিজাইনের অভিজ্ঞতা, গ্লোবাল ফুট প্রিন্ট, টেকনিক্যাল ক্যাপাসিটি, ফিনানশিয়াল এ্যানালাইসিস, রোল আউট ম্যানেজমেন্ট, রিস্ক ম্যানেজমেন্টসহ ৯টি মানদণ্ডে ১০০ নম্বরের ভিত্তিতে আগ্রহী দরদাতাদের যোগ্যতা মূল্যায়ন করা হবে। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হওয়ার পর আগ্রহীদের আবেদনের সঙ্গে দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে মূল্যায়ন কমিটি যোগ্যতা নিরূপণ করে নম্বর দেবে। এরপর যোগ্য প্রার্থীদের একটি তালিকা প্রকাশ করবে বিটিআরসি। সেই যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়েই নিলামের আয়োজন করা হবে।

এ বিষয়ে আগে কোন নীতিমালা না থাকায় কোন অপারেটরের সেবায় সন্তুষ্ট না হলে অন্য কোন অপারেটরে যাওয়ার সুযোগ কোন গ্রাহকের ছিল না। এই সেবা চালু হওয়ার পরই যে কেউ নম্বর ঠিক রেখেই অন্য অপারেটরে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। গত বছর ২ ডিসেম্বর এমএনপি নীতিমালায় অনুমোদন দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। তার আগে বিটিআরসি গ্রাহকদের অপারেটর বদলানোর সুযোগ করে দিতে প্রস্তাবনা তৈরি করে। এরপর তা গত বছর অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠালে মন্ত্রণালয় সেই প্রস্তারের অনুমতি প্রদান করে। পরে বিষয়টি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়।

নম্বর না বদলে গ্রাহকদের অন্য অপারেটরে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে ২০১৩ সালের জুনে মোবাইল ফোন অপারেটরদের নির্দেশ দেয় বিটিআরসি। তখন বিটিআরসি এই নির্দেশ অপারেটরদের দিলেও গাইড লাইন না থাকায় অপারেটররা সঠিক সময়ে এই সেবা চালু করতে পারেনি। এরপর বিটিআরসির তত্ত্বাবধানে এমএনপি চালু করতে নতুন গাইডলাইন তৈরি করে সরকারের কাছে দেয়া হয়। সরকারের কাছে অনুমোদিত হয়ে এলে এটার টেন্ডার এবং লাইসেন্স হবে। যে লাইসেন্স পাবে সে এটাকে অপারেট করবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। ওই বছরের অপারেটরদের এমএনপি সুবিধা বাস্তবায়ন করার বিষয়ে দেয়া ওই নির্দেশনায় বলা হয়, এমএনপি সুবিধা দিতে অপারেটররা গ্রাহকদের কাছ থেকে ৫০ টাকার বেশি নিতে পারবে না। ৭ মাসের মধ্যেই গ্রাহকদের এই সুবিধা দিতে হবে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ এই কাজের লাইসেন্স দেয়ার নিলাম পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় যোগ্যতার নতুন শর্ত যোগ করার উদ্যোগ নেয় টেলিযোগাযোগ বিভাগ। এর ধারাবাহিকতায় খসড়া সংশোধন করে কয়েকটি বিষয় নীতিমালার অন্তর্ভুক্ত করে বিটিআরসির লিগ্যাল এ্যান্ড লাইসেন্সিং বিভাগ। নিলাম প্রক্রিয়ায় আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা মূল্যায়ন করতে আগে নীতমালায় সুনির্দিষ্ট কোন মানদণ্ডের উল্লেখ ছিল না। সংশোধনের পর সেখানে ৯টি মানদণ্ডের ভিত্তিতে মূল্যায়নের কথা বলা হয়।

নতুন সংশোধনীর পর যে খসড়া চূড়ান্ত করা হয়, তাতে বিড আর্নেস্ট মানি পাঁচ লাখের বদলে ১০ লাখ টাকা, বেইজ প্রাইস ৫০ লাখের জায়গায় এক কোটি টাকা, বার্ষিক লাইসেন্স নবায়ন ফি ১০ লাখের বদলে ২০ লাখ টাকা এবং ব্যাংক গ্যারান্টি ৫০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক কোটি টাকা করা হয়। এছাড়া নীতিমালায় এমএনপি সংশ্লিষ্ট ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস (ভিএএস) দেওয়ার সুযোগ, এক শতাংশ ক্যাপাসিটি নিয়ে কার্যক্রম (রোলআউট অবলিগেশন) শুরুর বিধান রাখা হয়েছে। ‘রোলআউট অবলিগেশন’ পূরণে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করে নিলামে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে এই নীতিমালায়। খসড়ায় বলা হয়েছে, দেশি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিদেশি প্রতিষ্ঠানও এ নিলামে অংশ নিতে পারবে। তবে তাদের বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে আসতে হবে। এক্ষেত্রে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার হবে ৫১ শতাংশ এবং দেশি প্রতিষ্ঠানের ৪৯ শতাংশ। নিলাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স পাবে ১৫ বছরের জন্য এবং এই প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসা শুরুর দ্বিতীয় বছর থেকে সাড়ে ৫ শতাংশ হারে সরকারকে রাজস্ব দিতে হবে।

এদিকে বুধবার তারানা হালিম তার ভেরিফাইড ফেসবুক টাইমলাইনে একটি স্ট্যাটাসে লিখেছেন, এ বছরের সেপ্টেম্বরে এই সেবাটি চালু হতে যাচ্ছে। এমএনপি সেবা চালু হলে বাংলাদেশের যে কোনো মোবাইল গ্রাহক তার নম্বর ঠিক রেখেই অন্য কোনো অপারেটরের নেটওয়ার্কে সুইচ করতে পারবেন। তিনি লিখেছেন, আমি আনন্দিত, আসছে এমএনপি সার্ভিস। প্রধানমন্ত্রী এমএনপি গাইডলাইনে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছেন। সুতরাং আপনাদের আকাঙ্ক্ষিত এমএনপি সার্ভিস চালু হতে যাচ্ছে এ বছরের মধ্যেই। ‘এই সেবা চালু হলে বাংলাদেশের যে কোনো মোবাইল গ্রাহক তার নাম্বারটি ঠিক রেখেই অন্য অপারেটরের নেটওয়ার্কে সুইচ করতে পারবেন। অর্থাৎ, আপনি যদি এখন ০১৭ কোডের গ্রামীণফোনের গ্রাহক হয়ে থাকেন তবে ওই একই ০১৭ রেখেই আপনি অপারেটর পরিবর্তন করে অন্য যে কোনো অপারেটরের নেটওয়ার্ক পছন্দ অনুযায়ী পরিবর্তন করতে পারবেন।’

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের দায়িত্ব নেওয়ার পর চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিলের মধ্যেই এমএনপি নিলাম প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গাইডলাইনে বেশ কিছু পরিবর্তনের কারণে এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেওয়ার প্রয়োজন হওয়ায় এক মাস দেরি হয়েছে বলে জানান তারানা হালিম। ‘আশার কথা হলো এ বছরের মধ্যেই চালু হতে যাচ্ছে এমএনপি সার্ভিস।’ তারানা হালিম লিখেছেন, আমি প্রতিটা কাজের জন্য সর্বদা যে ডেডলাইন ঠিক করেছি, সেই ডেডলাইনের মধ্যেই কাজ সম্পন্ন করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছি। ‘এরই ধারাবাহিকতায় এমএনপি লাইসেন্সের নিলাম প্রক্রিয়াও দুই তিন মাসের মধ্যে শুরু করা এবং এ বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের মধ্যেই এই সার্ভিস শুরু করা আমার অগ্রাধিকারমূলক কাজ সমূহের মধ্যে একটি।’

প্রসঙ্গত, এমএনপি সুবিধা দিতে অপারেটরা গ্রাহকদের কাছ থেকে ৩০ টাকা নিতে পারবে। অর্থ মন্ত্রণালয় আগেই বিষয়টি অনুমোদন করেছে।একবার এমএনপি সুবিধা নেওয়ার পর গ্রাহক আবার নতুন কোনো অপারেটরে যেতে চাইলে তাকে ৪৫ দিন অপেক্ষা করতে হবে। বর্তমানে ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশ ছাড়াও প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানে মোবাইল নম্বর পোর্টেবিলিটি বা এমএনপি পরিষেবা চালু রয়েছে। অপারেটরের সেবায় সন্তুষ্ট না হলেও এখন অনেকে নম্বর পরিবর্তনের ঝক্কিতে যেতে চান না। এমএনপি চালু হলে তারা নম্বর ঠিক রেখেই অন্য অপারেটরে যেতে পারবে।